বিশ্বজুড়ে বাড়তে থাকা বাণিজ্য সুরক্ষাবাদ (প্রোটেকশনিজম) এবং বাজার বিভাজনের প্রভাব পড়তে পারে উন্নয়নশীল এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনীতিতে। এর ফলে বাংলাদেশের মতো স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের প্রক্রিয়াও বিলম্বিত হতে পারে বলে সতর্ক করেছে জাতিসংঘের এক নতুন প্রতিবেদন।
জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক সমীক্ষা এর ২০২৬ সংস্করণে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রসহ বড় অর্থনীতিগুলোর নতুন শুল্কনীতি এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় অস্থিরতা এই অঞ্চলের দেশগুলোর অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের গড় কার্যকর শুল্কহার ২০২৪ সালের ২.৮ শতাংশ থেকে বেড়ে এখন প্রায় ১৫ শতাংশে পৌঁছেছে। এর ফলে বাংলাদেশ, কম্বোডিয়া, লাওস এবং মিয়ানমারের মতো ছোট ও স্বল্পোন্নত দেশগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানির ক্ষেত্রে এখন ১৯ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্কের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। জাতিসংঘের মতে, এ ধরনের বাণিজ্য বাধা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ধীর করে দিতে পারে এবং এলডিসি থেকে উত্তরণের সময়সীমাও পিছিয়ে দিতে পারে।
বাংলাদেশ, নেপাল ও লাও পিডিআর চলতি বছরের ২৪ নভেম্বর এলডিসি থেকে উত্তরণের কথা রয়েছে। তবে বাংলাদেশ ও নেপাল ইতোমধ্যে ২০২৯ সাল পর্যন্ত তিন বছর সময় বাড়ানোর আবেদন করেছে জাতিসংঘে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টের এক রায়ের পর নতুন করে শুল্ক পরিবর্তনের ঘোষণা এসেছে, ফলে নীতিগত অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে।
জাতিসংঘের এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অর্থনৈতিক ও সামাজিক কমিশন বলছে, রপ্তানি অর্ডার কমে যাওয়ায় সংশ্লিষ্ট খাতে কর্মসংস্থান, মজুরি ও বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এর প্রভাব শুধু সরাসরি রপ্তানির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। আঞ্চলিক সরবরাহ শৃঙ্খলে কাঁচামাল ও যন্ত্রাংশ সরবরাহকারী দেশগুলোর চাহিদাও কমে যেতে পারে। বাংলাদেশে মোট টেক্সটাইল ও পোশাক রপ্তানির প্রায় এক-তৃতীয়াংশই আমদানিকৃত কাঁচামাল বা আপস্ট্রিম বাণিজ্যের ওপর নির্ভরশীল। ফলে সরবরাহ শৃঙ্খলে বিঘ্ন ঘটলে দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদনশীলতা কমে যেতে পারে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে প্রায় ৫ কোটি ৬০ লাখ কর্মসংস্থান যুক্তরাষ্ট্রের চাহিদার সঙ্গে সরাসরি বা সরবরাহ শৃঙ্খলের মাধ্যমে যুক্ত। এর বড় অংশই উৎপাদন খাতে। রপ্তানি কমে গেলে মজুরি কমে যেতে পারে এবং ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমিকরা দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে পড়তে পারেন।
বাংলাদেশ, কম্বোডিয়া, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার মতো দেশে তৈরি পোশাক খাতে বিপুল সংখ্যক নারী শ্রমিক কাজ করেন। বাংলাদেশের গার্মেন্ট খাতে প্রায় ৭০ শতাংশ শ্রমিক নারী। কম্বোডিয়ায় এই হার প্রায় ৮০ শতাংশ। অনেক ক্ষেত্রে তাদের কাজের ধরন—যেমন সেলাই, কাটিং ও ফিনিশিং—নিম্ন দক্ষতার এবং মজুরিও তুলনামূলকভাবে কম।
প্রতিবেদন বলছে, বাংলাদেশে প্রায় ৩২ শতাংশ গার্মেন্ট শ্রমিক ন্যূনতম মজুরির নিচে আয় করেন এবং প্রায় ৭ শতাংশ আন্তর্জাতিক দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করেন। ভিয়েতনামের মতো দেশে নারী শ্রমিকদের মজুরি পুরুষদের তুলনায় প্রায় ১৫ শতাংশ কম।
রপ্তানি চাহিদা কমে গেলে অনানুষ্ঠানিক ও সাব-কন্ট্রাক্ট শ্রমিকরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়বেন। কারণ এসব চাকরিতে চাকরির নিরাপত্তা, নোটিশ পিরিয়ড বা সামাজিক সুরক্ষা প্রায় নেই। চাহিদা কমে গেলে অনেক প্রতিষ্ঠান নতুন করে কর্মী নিয়োগ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারে। এতে পরিবারগুলোর খাদ্য, স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় ব্যয় কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
প্রতিবেদন আরও জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো উৎপাদন বৃদ্ধির ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে রয়েছে। অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর উৎপাদন বাড়ার প্রবণতা দেখা গেছে। 22তবে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা ও অনিশ্চিত চাহিদার কারণে অনেক দেশের পক্ষে দ্রুত নতুন বাজারে প্রবেশ করা কঠিন হবে বলেও সতর্ক করেছে জাতিসংঘ।

