মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাবে দেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় যে চাপ তৈরি হয়েছিল, তা এখন ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। ফলে ফিলিং স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ সারি কমে এসেছে এবং বাজারে জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতিও স্থিতিশীল হচ্ছে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) জানিয়েছে, পরিশোধিত জ্বালানি আমদানি বাড়ানোর কারণে মজুত উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে করে আগামী মে মাসের জ্বালানি তেল সরবরাহ নিয়ে আপাতত কোনো বড় ধরনের অনিশ্চয়তা নেই।
বর্তমানে স্টোরেজ ও জাহাজ মিলিয়ে বিপিসির হাতে প্রায় তিন লাখ টন ডিজেল মজুত রয়েছে। একই সঙ্গে অকটেন ও পেট্রোল নিয়েও যে উদ্বেগ ছিল, সেটিও এখন কেটে গেছে। সব মিলিয়ে মে মাসের জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে সংস্থাটির মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছে।
বিপিসি সূত্রে জানা যায়, মে মাসে আরও ১৭টি পার্সেলের মাধ্যমে প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ টন জ্বালানি দেশে আসবে। পাশাপাশি ইস্টার্ন রিফাইনারি পুনরায় উৎপাদনে ফেরায় স্থানীয় উৎপাদনও সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করবে। এতে করে জ্বালানি সরবরাহ ঘিরে গত প্রায় দুই মাস ধরে যে চাপ ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল, তার অবসান ঘটছে। এদিকে বিপিসির অপারেশনে যুক্ত কর্মকর্তা এবং তিনটি বিপণন কোম্পানির দায়িত্বশীলদের মধ্যেও স্বস্তি ফিরতে শুরু করেছে।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের মুখপাত্র ও যুগ্ম সচিব (অপারেশন অনুবিভাগ) মো. মনির হোসেন চৌধুরী বলেন, “সারাদেশে প্যানিক বায়িংয়ের কারণে মাঠপর্যায়ে একটি কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়েছিল। তবে বিপিসির স্বাভাবিক অপারেশন এবং আমদানি কার্যক্রম পরিকল্পিতভাবেই পরিচালিত হয়েছে।”
জ্বালানি সরবরাহে চাপ তৈরি হওয়া পরিস্থিতিতে দাম না বাড়িয়েই সংকট সামাল দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা। মূলত মার্চ মাসের শুরুর দিকে কৃত্রিম মজুত ঠেকাতে রেশনিং ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তিনি বলেন, “জ্বালানির দাম না বাড়িয়েই সংকট সামাল দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু বড় অংকের ভর্তুকি দিয়ে পুরো সরবরাহ চেইন ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। সে কারণে গত ২০ এপ্রিল সহনীয় মাত্রায় জ্বালানির দাম সমন্বয় করা হয়।”
সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া ছিল পরিকল্পিত ও সমন্বিত—এমন মন্তব্য করে তিনি আরও বলেন, “সরকার প্রত্যেকটি সিদ্ধান্ত সুচারুরূপে নিয়েছে। জ্বালানি বিভাগের প্রতিটি পরিকল্পনা ও নির্দেশনা ছিল গোছানো। এর সুফল এখন পাওয়া যাচ্ছে। মে মাসের প্রয়োজনীয় জ্বালানি আমাদের হাতে এসে গেছে।”
বর্তমান মজুত পরিস্থিতি নিয়ে তিনি জানান, এখনো প্রায় তিন লাখ টন ডিজেল বিপিসির হাতে রয়েছে। পাশাপাশি মে মাসে পরিকল্পনামাফিক আরও জ্বালানি দেশে পৌঁছাবে। এতে করে তরল জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে যে অনিশ্চয়তা ছিল, তা কেটে যাচ্ছে এবং মানুষের মধ্যেও স্বস্তি ফিরে এসেছে।
এদিকে জ্বালানি আমদানিতে নতুন একটি উদ্যোগ হিসেবে স্পট মার্কেট থেকে প্রথমবারের মতো ২৫ হাজার টন ডিজেল কেনা হচ্ছে বলেও জানান তিনি। তিনি বলেন, “এতদিন অনেক প্রতিষ্ঠান প্রস্তাব দিয়েছিল, কিন্তু কেউ চুক্তি করতে আসেনি। এবার প্রথমবারের মতো পেট্রোগ্যাস পিজি চুক্তি করেছে। তারা ২৫ হাজার টন ডিজেল সরবরাহ করবে। আশা করছি মে মাসেই এই চালান পাওয়া যাবে।”
চলতি এপ্রিল মাসে বিপুল পরিমাণ পরিশোধিত জ্বালানি দেশে আসছে। বিপিসির তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, এ মাসে মোট ১৭টি পার্সেলে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও চীন থেকে প্রায় ৬ লাখ ৭৭ হাজার টন জ্বালানি আমদানি করা হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে ৪ লাখ ৬২ হাজার ২৩৮ টন ডিজেল, ৬১ হাজার ৬৩৬ টন জেট এ-১ এবং ৫৩ হাজার ৩৬৪ টন অকটেন। পাশাপাশি পাইপলাইনের মাধ্যমে ভারতের নুমালিগড় রিফাইনারি থেকে ইতোমধ্যে আরও ৪০ হাজার টন ডিজেল দেশে এসেছে।
বিপিসি আরও জানিয়েছে, ২৮ এপ্রিল ৩৩ হাজার টন ডিজেল নিয়ে একটি জাহাজ আসছে। একইসঙ্গে মে মাসের নির্ধারিত ২৬ হাজার ৫১৮ টন অকটেনের একটি পার্সেলও আগাম ২৯ এপ্রিল পৌঁছানোর কথা রয়েছে। গত ১০ দিনে ডিজেল, অকটেন ও জেট ফুয়েলসহ একাধিক জ্বালানি নিয়ে ১০টির বেশি জাহাজ বাংলাদেশে এসেছে। এর মধ্যে কয়েকটি ইতোমধ্যে খালাস সম্পন্ন করে ফিরে গেছে। বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরে পাঁচটি জাহাজ খালাসরত অবস্থায় রয়েছে।
বিপিসির নিয়ন্ত্রণাধীন ৫, ৬ ও ৭ নম্বর ডলফিন জেটিতে এসব জাহাজ থেকে নিয়মিত জ্বালানি খালাস চলছে। এর মধ্যে ৫ নম্বর জেটিতে ‘এমটি কোয়েতা’ থেকে ৩৩ হাজার ৪০০ টনের বেশি ডিজেল খালাস করা হচ্ছে। ৬ নম্বর জেটিতে ‘এমটি জিং টং ৭৯৯’ থেকে ৩৪ হাজার ৬৬৭ টন জেট ফুয়েল নামানো হচ্ছে। আর ৭ নম্বর জেটিতে ‘এমটি লিয়ান সং হো’ থেকে লাইটারিংয়ের মাধ্যমে ডিজেল খালাস চলছে।
এছাড়া বন্দরের আলফা অ্যাংকরে অবস্থান করছে একাধিক জাহাজ, যার মধ্যে রয়েছে ‘এমটি এফপিএমসি ৩০’, ‘এমটি হাফনিয়া চিতা’ এবং ‘এমটি প্রাইভ অ্যাঞ্জেল’। এসব জাহাজ থেকে ধাপে ধাপে ডিজেল খালাস করা হচ্ছে। আরেকটি জাহাজ ‘এমটি লিয়ান সং হো’ থেকেও লাইটারিংয়ের মাধ্যমে প্রায় ৪১ হাজার ৯০৭ টন ডিজেল খালাস নেওয়া হচ্ছে।
বিপিসির এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্ধারিত সময়সীমা বা ‘লেকেন’ অনুযায়ী জাহাজ খালাস করা হচ্ছে। তিনি বলেন, “যেসব পার্সেলের লেকেন আছে, সেগুলো নির্ধারিত সময়েই খালাস করা হচ্ছে। আর যেগুলো লেকেন মিস করেছে, সেগুলো পরে খালাস করতে হচ্ছে। এতে অতিরিক্ত জরিমানা এড়ানো যায়, যদিও দায় শেষ পর্যন্ত সরবরাহকারীরই থাকে।”
তিনি আরও জানান, মে মাসের নির্ধারিত অকটেনের একটি চালান আগেই চলে আসছে। এই পার্সেলে ২৬ হাজার ৫১৮ টন অকটেন থাকবে এবং এটি ২৯ এপ্রিল বন্দরে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। আগামী মে মাসে দেশে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি আমদানির শিডিউল চূড়ান্ত করেছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। পরিকল্পনা অনুযায়ী, মোট প্রায় সাড়ে ৫ লাখ টন জ্বালানি দেশে আসবে।
এর মধ্যে একটি অকটেনের পার্সেল আগেভাগেই আসছে। ২৫ হাজার টনের পরিবর্তে ২৬ হাজার ৫১৮ টন অকটেন বহনকারী এই চালানটি ২৯ এপ্রিল বন্দরে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। বিপিসির পরিকল্পনায় আরও রয়েছে ১৩টি পার্সেলে প্রায় সাড়ে তিন লাখ টন ডিজেল আমদানি। পাশাপাশি দুটি পার্সেলে ৪০ হাজার টন জেট ফুয়েল এবং তিনটি পার্সেলে ৭৫ হাজার টন ফার্নেস অয়েল দেশে আনা হবে। এছাড়া স্পট মার্কেট থেকে মে মাসে আরও একটি পৃথক পার্সেল আসবে। এতে ২৫ হাজার টন জ্বালানি থাকবে বলে জানা গেছে।
দুবাইভিত্তিক সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ‘পেট্রোগ্যাস ইন্টারন্যাশনাল করপোরেশন’-এর পক্ষে বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠান জিসিজি গ্লোবাল কমার্স গেটওয়ে লিমিটেড এবং বিপিসির মধ্যে চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে।
এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিপিসির এক কর্মকর্তা জানান, আগে প্রতিষ্ঠানটি ২৫ হাজার টন অকটেন সরবরাহের প্রস্তাব দিয়ে প্রাথমিক অনুমোদন নিয়েছিল, তবে পরে চুক্তি সম্পন্ন হয়নি। তিনি বলেন, “পরে সেই প্রস্তাব বাতিল করে নতুন করে ২৫ হাজার টন ডিজেল সরবরাহের জন্য পিজি দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। এবার তাদের সঙ্গে চুক্তিও সম্পন্ন হয়েছে।”

