শ্রমের মর্যাদা ও ন্যায্য অধিকার আদায়ের যে লড়াই ১৩০ বছর আগে শিকাগোর হে মার্কেটে শুরু হয়েছিল, তা আজকের আধুনিক করপোরেট অফিসে এসে নতুন রূপ নিয়েছে। সময় বদলালেও বদলায়নি বঞ্চনার চিত্র। একসময় যেখানে সংগ্রাম ছিল দীর্ঘ কর্মঘণ্টার বিরুদ্ধে, এখন সেই লড়াই দাঁড়িয়েছে মানসিক অবসাদ, চাপ এবং স্বীকৃতির অভাবে।
বৈশ্বিক এইচআর প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ওয়ার্কহিউম্যানের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে করপোরেট দুনিয়ার এক অস্বস্তিকর চিত্র। এতে বলা হয়, এক ধরনের ‘প্রফিটাবিলিটি প্যারাডক্স’ তৈরি হয়েছে—প্রতিষ্ঠানগুলো যখন ব্যবসায়িকভাবে সফলতার শীর্ষে পৌঁছাচ্ছে, তখনই কর্মীদের মানসিক ও শারীরিক শক্তি দ্রুত কমে যাচ্ছে।
ইউরোপের ১০টি দেশের ৬ হাজার কর্মীর ওপর পরিচালিত এই জরিপে দেখা যায়, প্রায় অর্ধেক কর্মী প্রতিদিন কাজ শেষে চরম ক্লান্তি নিয়ে বাড়ি ফেরেন। অংশগ্রহণকারীদের ৭২ শতাংশ জানিয়েছেন, তাদের প্রতিষ্ঠান আর্থিকভাবে সফল হলেও এই সাফল্যের ভেতরেই ৫১ শতাংশ কর্মী আগের চেয়ে বেশি মানসিক চাপে রয়েছেন। একই সঙ্গে ৪৮ শতাংশ কর্মী জানিয়েছেন, কাজ শেষে এতটাই ক্লান্ত থাকেন যে ব্যক্তিগত বা সামাজিক জীবনের জন্য তাদের কোনো শক্তি অবশিষ্ট থাকে না।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, এই চাপের অন্যতম বড় কারণ কাজের যথাযথ স্বীকৃতির অভাব। জরিপে দেখা গেছে, মাত্র ৪১ শতাংশ কর্মী গত তিন মাসে তাদের কাজের জন্য কোনো প্রশংসা বা স্বীকৃতি পেয়েছেন। আর ৩৬ শতাংশ মনে করেন, তাদের কাজ প্রতিষ্ঠানের নীতিনির্ধারকদের নজরেই পড়ে না। এই পরিস্থিতিকে প্রতিবেদনে ‘ইনভিজিবিলিটি ম্যাপ’ বা অদৃশ্যতার মানচিত্র হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়, কর্মীর পরিশ্রম যখন অদেখা থেকে যায়, তখন প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য ও কর্মীর মানসিক সংযোগ ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে।
অন্যদিকে, যেসব কর্মী নিয়মিত স্বীকৃতি পান, তাদের মধ্যে প্রতিষ্ঠানের প্রতি ‘বিলংগিংনেস’ বা দায়িত্ববোধ প্রায় দ্বিগুণ দেখা যায়। জরিপে অংশগ্রহণকারীদের ৭৭ শতাংশ জানিয়েছেন, সামান্য প্রশংসাও তাদের নির্ধারিত দায়িত্বের বাইরে বাড়তি অবদান রাখতে অনুপ্রাণিত করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকের অধিকার শুধু বেতন বা কর্মঘণ্টার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মানসিক স্বাস্থ্যের সুরক্ষা এবং কাজের স্বীকৃতিও এখন মৌলিক অধিকার হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত।
১৮৮৬ সালের মে দিবসে শ্রমিকদের দাবি ছিল ৮ ঘণ্টা কাজ, ৮ ঘণ্টা বিশ্রাম এবং ৮ ঘণ্টা বিনোদন কিন্তু ২০২৬ সালে এসে সেই বার্তাই নতুনভাবে সামনে আসছে—মুনাফার প্রতিযোগিতায় কর্মীর মানসিক স্বাস্থ্য যেন চাপা না পড়ে, সেটিই এখন সময়ের বড় দাবি।

