বাংলাদেশ রেলওয়েতে গত এক দশকে অবকাঠামো ও পরিচালনায় বড় অঙ্কের বিনিয়োগ হয়েছে। তবুও দেশের পণ্য পরিবহন ব্যবস্থায় রেলের অবস্থান এখনো দুর্বল। অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞদের মতে, রেলকে এখনো মূলত সেবামূলক প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখা হচ্ছে, বাণিজ্যিক শক্তি হিসেবে নয়।
দেশের মোট পণ্য পরিবহনের ৯৬ শতাংশ এখনো সড়কপথে হয়। রেলপথের অংশ মাত্র ৩ শতাংশ এবং নৌপথের ১ শতাংশ। অথচ বিশ্বে রেলকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে শক্তিশালী লজিস্টিক অর্থনীতি।
বিশ্বের বড় অর্থনীতিগুলোতে মালবাহী রেলকে আয়ের প্রধান উৎস হিসেবে ধরা হয়। যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও জার্মানিতে পণ্য পরিবহন থেকে অর্জিত আয় যাত্রীসেবায় ভর্তুকি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ভারতের রেলে মোট আয়ের প্রায় ৬৭ শতাংশ আসে মালবাহী খাত থেকে। পাকিস্তানেও এই খাত থেকে আসে প্রায় ৩৩ দশমিক ৩ শতাংশ রাজস্ব। কিন্তু বাংলাদেশে পরিস্থিতি ভিন্ন। রেলওয়ের প্রতি ১০০ টাকা আয়ের বিপরীতে ব্যয় হচ্ছে ২০৯ টাকা। ফলে প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরে লোকসান নির্ভর কাঠামোর মধ্যে আটকে আছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রেলের সমস্যাকে শুধু লোকসান হিসেবে দেখা ঠিক নয়। এটি মূলত কাঠামোগত ও কৌশলগত দুর্বলতা। দীর্ঘদিন ধরে রেলকে ব্যবসায়িক পরিকল্পনার বাইরে রেখে পরিচালনা করা হয়েছে। লোকোমোটিভ সংকট, সময়মতো কনটেইনার ট্রেন চালাতে না পারা এবং যাত্রীসেবাকে অগ্রাধিকার দিতে গিয়ে পণ্য পরিবহনকে উপেক্ষা করা—এসবই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। ফলে অনেক রফতানিকারক সময়মতো পণ্য পৌঁছাতে না পেরে সড়কপথের দিকে ঝুঁকছেন। এতে খরচ বাড়ছে এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে ব্যবসায়ীরা।
রেলওয়ের সবচেয়ে বড় সংকটকে অনেকে “দার্শনিক দ্বন্দ্ব” হিসেবে দেখছেন। একদিকে প্রতিষ্ঠানটি নিজেকে সেবামূলক সরকারি সংস্থা হিসেবে উপস্থাপন করে, অন্যদিকে প্রকল্প অনুমোদনে মুনাফার সম্ভাবনা দেখানো হয়। ফলে কাগজে-কলমে লাভজনক প্রকল্প অনুমোদন পেলেও বাস্তবে কাঠামোগত সংস্কার না হওয়ায় লোকসান অব্যাহত থাকে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ রেলকে বাণিজ্যিকভাবে পুনর্গঠন করেছে। ভারত আলাদা ফ্রেইট করিডোর তৈরি করে শিল্প ও বন্দরের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ দিয়েছে। চীন মালবাহী ও যাত্রীবাহী রেল আলাদা করে দক্ষতা বাড়িয়েছে। জার্মানি রেল স্টেশনের আশপাশে বাণিজ্যিক স্থাপনা গড়ে রাজস্ব বাড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে রেল মূলত ব্যক্তিখাতনির্ভর মালবাহী শিল্প হিসেবে পরিচালিত হয়। এই উদাহরণগুলো দেখায়, রেলকে শুধু সেবা খাত হিসেবে সীমাবদ্ধ রাখলে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়।
বাংলাদেশের জন্য করণীয় ও কৌশলগত পরিবর্তন: বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে রেল ব্যবস্থাকে টেকসই করতে হলে প্রথমে এটিকে লজিস্টিক কেন্দ্রিক বাণিজ্যিক খাতে রূপান্তর করতে হবে। প্রধান করণীয়গুলোর মধ্যে রয়েছে—
- পণ্য পরিবহনকে রেলের প্রধান অগ্রাধিকার করা
- ঢাকা–চট্টগ্রাম করিডোরে কনটেইনার ট্রেনের জন্য আলাদা সময়সূচি নির্ধারণ
- বন্দর ও ইপিজেডের সঙ্গে সরাসরি রেল সংযোগ স্থাপন
- সময়মতো ডেলিভারি নিশ্চিত করতে সার্ভিস লেভেল অ্যাগ্রিমেন্ট চালু করা
- রেলের পণ্য পরিবহনের অংশ ২০ শতাংশে উন্নীত করার নির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ
এছাড়া লোকোমোটিভ ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, উৎসব মৌসুমে সংকট এড়াতে আলাদা ইঞ্জিন পুল গঠন এবং প্রয়োজনে বেসরকারি খাত থেকে লিজ নেওয়ার পরামর্শও দেওয়া হয়েছে।
রেলের বিশাল জমি দীর্ঘদিন ধরে অব্যবহৃত বা দখলকৃত অবস্থায় রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই সম্পদ সঠিকভাবে ব্যবহার করলে প্রতি বছর বিপুল রাজস্ব অর্জন সম্ভব। ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটের মতো বড় স্টেশন এলাকায় পিপিপি মডেলে বাণিজ্যিক স্থাপনা, লজিস্টিক পার্ক ও কোল্ড স্টোরেজ গড়ে তোলা হলে রেলের আয় বাড়তে পারে।
রেলের বর্তমান সংকটকে কেবল অবকাঠামোগত সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি মূলত নীতি, পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনার সমন্বয়হীনতার ফল। রাজনৈতিক সদিচ্ছা, বাণিজ্যিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার ছাড়া রেলকে কার্যকর লজিস্টিক ব্যবস্থায় রূপান্তর করা সম্ভব নয়।

