সম্প্রতি গবেষণা ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) আয়োজিত ‘জ্বালানির ফাঁদে বন্দি অর্থনীতি?’ শীর্ষক এক ওয়েবিনারে এসব চিত্র উঠে আসে। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান। এতে অংশ নেন অর্থনীতি, জ্বালানি ও শিল্প খাতের বিশেষজ্ঞরা।
ওয়েবিনারে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, লোডশেডিং ও জ্বালানি অনিশ্চয়তার কারণে দেশের কলকারখানাগুলো এখন পূর্ণ সক্ষমতায় চলতে পারছে না। উৎপাদন সক্ষমতা নেমে এসেছে প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশে। একই সঙ্গে জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচ বা কস্ট অব ডুইং বিজনেস প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য এ সাত্তার মণ্ডল বলেন, কৃষি এখন যান্ত্রিক নির্ভরতায় চলে গেছে। প্রায় ৪২ লাখ ডিজেলচালিত ইঞ্জিন কৃষিতে ব্যবহার হচ্ছে। ভবিষ্যতে যান্ত্রিকীকরণ বাড়লে ডিজেলের চাহিদা আরও বাড়বে। তিনি সতর্ক করে বলেন, জ্বালানির দাম ও সংকট অব্যাহত থাকলে শুধু উৎপাদন ব্যয় নয়, দেশের খাদ্যনিরাপত্তাও ঝুঁকির মুখে পড়বে।
বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান আনোয়ার-উল আলম পারভেজ বলেন, জ্বালানি ছাড়া শিল্প ও সেবা খাত সচল রাখা কঠিন। তাঁর মতে, জ্বালানি সংকটে শিল্পের উৎপাদন অর্ধেকে নেমে এসেছে। পরিবহন ব্যয়ও বেড়ে গেছে, যা সামগ্রিক উৎপাদন ব্যয় আরও বাড়াচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, উৎপাদন খরচ ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে এবং উৎপাদন কমেছে ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ। এ পরিস্থিতি থেকে বের হতে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি পরিকল্পনা নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। পাশাপাশি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে কার্যকরভাবে চালানো এবং গ্যাসের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করার কথাও তিনি উল্লেখ করেন।
সাবেক জ্বালানি সচিব একেএম জাফর উল্লাহ খান বলেন, দেশের বড় দুর্বলতা হলো পর্যাপ্ত জ্বালানি মজুদ সক্ষমতার অভাব। তাঁর মতে, আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জ্বালানির দাম ওঠানামা করবে, কিন্তু নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। সীমিত স্টোরেজ থাকলে বড় ধরনের সংকট সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
ট্রেড সার্ভিসেস ইন্টারন্যাশনালের চেয়ারম্যান সৈয়দ মাহমুদুল হক বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে সামান্য মূল্যবৃদ্ধিও দেশের আমদানি ব্যয়ে বড় চাপ সৃষ্টি করে। তিনি জ্বালানি উৎস বৈচিত্র্য আনার ওপর গুরুত্ব দেন। তাঁর মতে, একক উৎসের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নতুন সরবরাহ উৎস খুঁজতে হবে।
বাংলাদেশ পেট্রল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ নাজমুল হক অভিযোগ করেন, চলমান সংকটেও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে মালিকদের কোনো আনুষ্ঠানিক আলোচনা হয়নি। তিনি সংকট সমাধানে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর জোর দেন। জ্বালানির অনিশ্চয়তা এখন শুধু শিল্প খাত নয়, পুরো অর্থনীতিকেই চাপে ফেলছে। উৎপাদন কমছে, ব্যয় বাড়ছে, আর সমাধানের পথে এখনো স্পষ্ট অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না।

