বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে এমন এক সময় পার করছে, যেখানে বাইরে থেকে আসা ধাক্কা এবং ভেতরের দুর্বলতা একসঙ্গে চাপ তৈরি করছে। একদিকে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা জ্বালানি ব্যয় বাড়ানোর আশঙ্কা তৈরি করেছে, অন্যদিকে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের পর বাণিজ্য সুবিধা কমে যাওয়ার বাস্তবতা সামনে আসছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পশ্চিমা বাজারে নীতিগত পরিবর্তন ও শুল্ক অনিশ্চয়তা। ফলে দেশের অর্থনীতি এখন এক ধরনের তিনমুখী সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে আছে।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি যখন মহামারির সময়ের পর সবচেয়ে দুর্বল পর্যায়ে নেমে আসছে, তখন শুধু সাময়িক ব্যবস্থা নিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন। এখন প্রয়োজন গভীর ও বাস্তবভিত্তিক কাঠামোগত সংস্কার।
সবচেয়ে তাৎক্ষণিক ঝুঁকি তৈরি হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা থেকে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি ঘিরে অনিশ্চয়তা বাংলাদেশের মতো জ্বালানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য বড় উদ্বেগের বিষয়। বাংলাদেশ তার জ্বালানির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এই অঞ্চল থেকে সংগ্রহ করে। তাই সেখানে যুদ্ধ, উত্তেজনা বা সরবরাহে বাধা তৈরি হলে তার প্রভাব সরাসরি দেশের জ্বালানি বিল, পরিবহন ব্যয়, শিল্প উৎপাদন এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর পড়ে।
প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, বড় ধরনের জ্বালানি মূল্যধাক্কা হলে জাতীয় জ্বালানি বিল ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে ১৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। এটি শুধু সরকারের হিসাবের একটি সংখ্যা নয়। এর মানে হলো, দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর নতুন চাপ, আমদানি ব্যয়ের বৃদ্ধি, উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়া এবং শেষ পর্যন্ত বাজারে পণ্যের দাম আরও বাড়ার ঝুঁকি। এমনিতেই মানুষ দীর্ঘ সময় ধরে মূল্যস্ফীতির চাপে আছে। তার ওপর জ্বালানি ব্যয় বাড়লে সাধারণ পরিবারের ক্রয়ক্ষমতা আরও কমে যেতে পারে।
দ্বিতীয় বড় চাপ আসছে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণকে ঘিরে। এই উত্তরণ নিঃসন্দেহে দেশের উন্নয়নযাত্রার একটি স্বীকৃতি। কিন্তু এর সঙ্গে সঙ্গে অনেক বাণিজ্য সুবিধা কমে যাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। এতদিন যেসব অগ্রাধিকারমূলক বাজার সুবিধা রপ্তানি খাতকে সহায়তা করেছে, সেগুলোর একটি অংশ ধীরে ধীরে দুর্বল হতে পারে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকতে হলে বাংলাদেশকে শুধু কম দামের শ্রমনির্ভর উৎপাদনের ওপর ভর করে চললেই হবে না; দরকার হবে পণ্যের বৈচিত্র্য, মানোন্নয়ন, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং নতুন বাজারে প্রবেশের সক্ষমতা।
বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের বড় অংশ এখনো তৈরি পোশাক খাতের ওপর নির্ভরশীল। এই একক নির্ভরতা দীর্ঘদিন অর্থনীতিকে এগিয়ে নিয়েছে, কিন্তু বর্তমান বিশ্ববাজারে এটি একই সঙ্গে ঝুঁকিও তৈরি করছে। পশ্চিমা বাজার, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতির অনিশ্চয়তা তৈরি পোশাক খাতের জন্য উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। যদি প্রধান রপ্তানি বাজারে শুল্ক বা বাণিজ্যনীতি কঠিন হয়, তাহলে বাংলাদেশের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
তবে শুধু বাইরের সংকটকে দায়ী করলে পুরো ছবিটি বোঝা যাবে না। দেশের ভেতরেও বেশ কিছু কাঠামোগত দুর্বলতা দীর্ঘদিন ধরে অর্থনীতিকে দুর্বল করে রেখেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো আর্থিক খাতের সংকট। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, খেলাপি ঋণের হার ৩০ শতাংশের বেশি। এত বড় পরিমাণ অনাদায়ী ঋণ ব্যাংক খাতের স্বাভাবিক ঋণপ্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করে। ব্যাংক যখন পুরোনো খারাপ ঋণের বোঝায় চাপে থাকে, তখন নতুন উদ্যোক্তা, শিল্পপ্রতিষ্ঠান বা ব্যবসায়ীদের কাছে প্রয়োজনীয় অর্থ পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে।
বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ মাত্র ৬ শতাংশের ঐতিহাসিক নিম্ন পর্যায়ে থাকা একটি বড় সতর্কসংকেত। এর অর্থ, বিনিয়োগকারীরা হয় আত্মবিশ্বাস হারাচ্ছেন, নয়তো ব্যাংক থেকে প্রয়োজনীয় অর্থ পাচ্ছেন না। দুই অবস্থাই অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর। কারণ বিনিয়োগ না হলে নতুন কারখানা হয় না, উৎপাদন বাড়ে না, কর্মসংস্থান তৈরি হয় না এবং প্রবৃদ্ধির গতি দুর্বল হয়ে পড়ে।
দেশীয় বিনিয়োগকারীরা যখন নতুন যন্ত্রপাতি কিনতে বা কারখানা সম্প্রসারণে দ্বিধায় থাকেন, তখন বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও সতর্ক হয়ে যান। গ্যাস ও বিদ্যুতের নির্ভরযোগ্য সরবরাহ না থাকলে শিল্প পরিকল্পনা ঝুঁকির মুখে পড়ে। আবার নীতিনির্ধারণ ও ব্যবসা বাস্তবায়নের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব থাকলে উদ্যোক্তারা ভবিষ্যৎ নিয়ে নিশ্চিত হতে পারেন না। ফলে অর্থনীতিতে এক ধরনের অনিশ্চয়তার কুয়াশা তৈরি হয়।
রাজস্ব খাতেও দুর্বলতা স্পষ্ট। কর আদায় ও মোট দেশজ উৎপাদনের অনুপাত ৭ শতাংশের নিচে আটকে আছে। অর্থাৎ অর্থনীতির আকারের তুলনায় সরকার যথেষ্ট রাজস্ব সংগ্রহ করতে পারছে না। এর ফলে উন্নয়ন ব্যয়, সামাজিক নিরাপত্তা, অবকাঠামো এবং জরুরি সেবা খাতে প্রয়োজনীয় অর্থের সংকট তৈরি হয়। রাজস্ব ঘাটতি পূরণে সরকার যখন ব্যাংক খাত থেকে বেশি ঋণ নেয়, তখন বেসরকারি খাতের জন্য ঋণের সুযোগ আরও কমে যায়। এতে বিনিয়োগ কমে এবং অর্থনৈতিক গতি আরও ধীর হয়ে পড়ে।
সংখ্যার পেছনে মানুষের বাস্তব জীবনও আছে। মূল্যস্ফীতি দীর্ঘ সময় ধরে মজুরি বৃদ্ধির চেয়ে বেশি থাকলে সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের প্রকৃত আয় কমে যায়। অর্থাৎ আয় হয়তো কাগজে কিছুটা বাড়ছে, কিন্তু সেই আয় দিয়ে আগের মতো পণ্য ও সেবা কেনা যাচ্ছে না। প্রায় অর্ধদশক ধরে ক্রয়ক্ষমতার এই ক্ষয় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তুলেছে। খাদ্য, বাসা ভাড়া, পরিবহন, শিক্ষা ও চিকিৎসা ব্যয়ের চাপ মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের পরিবারকে আরও দুর্বল করে দিচ্ছে।
চলতি হিসাবে ঘাটতি মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ১ শতাংশ। সংখ্যাটি আপাতভাবে বড় মনে না হলেও এর পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে রেমিট্যান্স। মার্চ মাসে প্রবাসী কর্মীরা ৩ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন ডলার দেশে পাঠিয়েছেন, যা অর্থনীতির জন্য বড় স্বস্তি। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই রেমিট্যান্স কি দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত দুর্বলতা ঢাকার জন্য ব্যবহার হওয়া উচিত? রেমিট্যান্স হওয়া উচিত বিনিয়োগ, সঞ্চয় ও উৎপাদনশীল কাজে ব্যবহারের শক্তি। কিন্তু যদি এটি বারবার বাণিজ্য ঘাটতি সামাল দেওয়ার জরুরি ব্যান্ডেজে পরিণত হয়, তবে সেটি টেকসই সমাধান নয়।
এখন সবচেয়ে জরুরি হলো সংস্কারকে বাইরের চাপ হিসেবে না দেখে দেশের নিজের প্রয়োজন হিসেবে গ্রহণ করা। ব্যাংক খাতের অনিয়ম দূর করা, খারাপ ঋণ নিয়ন্ত্রণে আনা, রাজস্ব সংগ্রহ আধুনিক করা, কর ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা বাড়ানো এবং রপ্তানি পণ্যে বৈচিত্র্য আনা—এসব এখন আর বিলম্ব করার মতো বিষয় নয়। এগুলো শুধু আন্তর্জাতিক ঋণদাতাদের শর্ত পূরণের জন্য নয়; বরং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক নিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য।
পুরোনো পদ্ধতিতে অর্থনীতি চালানোর সুযোগ দ্রুত কমে আসছে। ভারী ভর্তুকি, একক রপ্তানি খাতের ওপর অতিনির্ভরতা, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা উপেক্ষা করা এবং রাজস্ব আদায়ে ঢিলেঢালা মনোভাব—এসব দিয়ে বর্তমান বৈশ্বিক অস্থিরতার মধ্যে নিরাপদে থাকা সম্ভব নয়। বাইরের পরিবেশ যত বেশি অনিশ্চিত হবে, ভেতরের ভিত্তি তত বেশি শক্ত হতে হবে।
এই সংকট মোকাবিলায় দুটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি। প্রথমত, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। বিকল্প জ্বালানি উৎস, দক্ষ ব্যবহার, অপচয় কমানো এবং দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ পরিকল্পনা ছাড়া শিল্প খাত স্থিতিশীল থাকবে না। দ্বিতীয়ত, আর্থিক ও কর খাতে কঠোর, স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য সংস্কার করতে হবে। ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা না ফিরলে বিনিয়োগের গতি ফিরবে না। আবার কর ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা না এলে সরকারের উন্নয়ন সক্ষমতাও সীমিত থাকবে।
বাংলাদেশ এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে সিদ্ধান্তের গতি ও মান ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। সরকার যদি নীতির সঙ্গে ব্যবসায়ীদের বাস্তব প্রত্যাশার সমন্বয় করতে পারে, তাহলে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের পরও একটি শক্তিশালী ও প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতি গড়ে তোলা সম্ভব। কিন্তু যদি আর্থিক খাতের রক্তক্ষরণ চলতেই থাকে, রাজস্ব দুর্বল থাকে এবং রপ্তানি বৈচিত্র্য না আসে, তাহলে পুনরুদ্ধার হবে ভঙ্গুর ও অনিশ্চিত।
অর্থনীতির ঘর এখনো দাঁড়িয়ে আছে। তাই ঝড়ের পর নয়, ঝড়ের আগেই ভিত্তি মেরামত করার সময় এখন। বাংলাদেশের সামনে সংকট যেমন বড়, তেমনি সুযোগও আছে। সঠিক সংস্কার, বাস্তবভিত্তিক নীতি এবং শক্তিশালী বাস্তবায়নই পারে এই চাপকে ভবিষ্যতের প্রস্তুতিতে রূপ দিতে।

