আগামী ২০২৬–২৭ অর্থবছরের জন্য ৩ লাখ কোটি টাকার উন্নয়ন বাজেট বা বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) প্রস্তাব করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। প্রস্তাবটি শিগগিরই জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) সভায় অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে।
পরিকল্পনা কমিশনের সচিব এসএম শাকিল আখতার জানিয়েছেন, প্রস্তাবিত এডিপিতে মোট ৩ লাখ কোটি টাকার মধ্যে ২ লাখ ২৬ হাজার কোটি টাকা বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে বরাদ্দ রাখা হয়েছে। বাকি ৭৪ হাজার কোটি টাকা রাখা হয়েছে বিশেষ প্রয়োজনে ব্যবহারের জন্য থোক বরাদ্দ হিসেবে, যা সামাজিক উন্নয়ন সহায়তা ও জরুরি খাতে ব্যয় করা হবে।
তিনি বলেন, উন্নয়ন বাজেটের অর্থায়নে বৈদেশিক ঋণ ও সহায়তা থেকে আসবে ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা। আর বাকি ১ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা আসবে সরকারি তহবিল থেকে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ তাদের উন্নয়ন প্রকল্পে যে চাহিদা দিয়েছে, তা মিলিয়ে মোট ২ লাখ ২৬ হাজার কোটি টাকার বরাদ্দ নির্ধারণ করা হয়েছে। অতিরিক্ত ৭৪ হাজার কোটি টাকা আপাতত থোক বরাদ্দ হিসেবে রাখা হয়েছে, যা প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার করা হবে।
আগামী ১১ মে পরিকল্পনা কমিশনের এনইসি ভবনে বর্তমান সরকারের প্রথম এনইসি সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। ওই সভায় উন্নয়ন বাজেট প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে। সেখানে বরাদ্দে কিছু পরিবর্তন বা কাটছাঁট আসতে পারে বলেও ইঙ্গিত দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
পরিকল্পনা সচিব আরও জানান, প্রকল্প বাস্তবায়নের বাস্তব চাহিদা অনুযায়ী বরাদ্দ পুনর্বিন্যাসের সুযোগ থাকবে। অনেক সময় অনুমোদিত বরাদ্দ পুরোপুরি ব্যয় নাও হতে পারে, আবার কোথাও ঘাটতি দেখা দিলে থোক বরাদ্দ থেকে সমন্বয় করা হবে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ ও পরিকল্পনা কমিশনের নথি অনুযায়ী, থোক বরাদ্দের একটি বড় অংশ রাখা হয়েছে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও স্থানীয় সরকার খাতে।
স্বাস্থ্য খাতে চলমান উন্নয়ন প্রকল্পে ৬ হাজার ৮ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব রয়েছে। পাশাপাশি থোক বরাদ্দ হিসেবে রাখা হয়েছে ২০ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের জন্য মোট বরাদ্দ ধরা হয়েছে ৮ হাজার ৪৪৫ কোটি টাকা, যার মধ্যে ৬ হাজার ৮০০ কোটি টাকাই থোক বরাদ্দ।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জন্য চলমান প্রকল্পে ৫ হাজার ৪৮ কোটি টাকা এবং থোক বরাদ্দ হিসেবে ১৬ হাজার ২৯৯ কোটি টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের জন্য বরাদ্দ ধরা হয়েছে ৯ হাজার ৩৩৫ কোটি টাকা, যার মধ্যে থোক বরাদ্দ ১১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। এছাড়া স্থানীয় সরকার বিভাগে ৭ হাজার ৫৬২ কোটি টাকা এবং কারিগরি ও মাদরাসা শিক্ষা বিভাগে ৩ হাজার ৭৯ কোটি টাকা থোক বরাদ্দের প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
থোক বরাদ্দের এই বড় পরিমাণ নিয়ে নীতিনির্ধারণী মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে। পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) নির্বাহী চেয়ারম্যান এবং সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, থোক বরাদ্দ বেশি হলে ইচ্ছাধীন ব্যয়ের ঝুঁকি তৈরি হয়। তার মতে, এটি অনেক সময় রাজনৈতিক বিবেচনা বা পছন্দনির্ভর প্রকল্পে অর্থ ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে সীমিত পরিসরে থোক বরাদ্দ রাখা যেতে পারে, যাতে নমনীয়তা বজায় থাকে।
তিনি আরও বলেন, স্বাস্থ্য খাতে সরকারের বড় পরিকল্পনা রয়েছে। অনেক উদ্যোগ এখনো পূর্ণাঙ্গ প্রকল্পে রূপ নেয়নি। সেসব বাস্তবায়নের সুযোগ রাখতেই থোক বরাদ্দ রাখা হতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে পরিকল্পনা শক্তিশালী করা এবং প্রশাসনিক সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি।
সব মিলিয়ে নতুন এডিপি প্রস্তাব উন্নয়ন ব্যয়ের বড় কাঠামো নির্দেশ করলেও, থোক বরাদ্দের পরিমাণ ও ব্যবহার পদ্ধতি নিয়ে নজর থাকবে নীতিনির্ধারক ও অর্থনীতিবিদদের।

