জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) চলতি সময়ে প্রায় ৮৮ হাজার আয়কর রিটার্ন অডিট বা নিরীক্ষার জন্য নির্বাচন করেছে। এ সিদ্ধান্ত ঘিরে এখন মাঠপর্যায়ে ব্যাপক কার্যক্রম চলছে। তবে এই প্রক্রিয়া নিয়ে করদাতাদের একাংশের মধ্যে অসন্তোষ ও হয়রানির অভিযোগও সামনে আসছে।
অডিটে পড়া এসব রিটার্নের বড় অংশই নিয়মিত ও তুলনামূলক কম আয়ের করদাতাদের। অনেক করদাতা অভিযোগ করছেন, নিয়মিত কর পরিশোধ করার পরও এখন তারা অডিটের আওতায় পড়েছেন। ফলে আয়-ব্যয়ের বিভিন্ন কাগজপত্র সংগ্রহ করে বারবার কর অফিসে যেতে হচ্ছে। তদন্ত কর্মকর্তারা বিভিন্ন নথিপত্র চাওয়ায় তাদের সময় ও ভোগান্তি বাড়ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। অনেকেই বলছেন, “নিয়মিত কর দিয়েও এখন অডিটে পড়েছি”—এতে সাধারণ করদাতাদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে রাজস্ব খাতের চিত্রে বড় ধরনের বৈষম্যও দেখা যাচ্ছে। বড় মাপের সম্পদশালী করদাতাদের কাছে এনবিআরের বকেয়া রাজস্বের পরিমাণ এখন এক লাখ কোটি টাকার বেশি। দীর্ঘ সময় পার হলেও এই বিপুল বকেয়া আদায়ে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি বলে জানা গেছে। পাশাপাশি প্রায় ৩৩ হাজার রাজস্ব মামলা এখনো নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। এদিকে মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানো না হওয়ায় নিম্ন ও মধ্য আয়ের করদাতাদের ওপর চাপ বাড়ছে বলেও সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
রাজস্ব খাতের বিশ্লেষকরা বলছেন, ছোট করদাতাদের ওপর অডিটের চাপ বাড়ানোর পরিবর্তে বড় করদাতাদের কাছ থেকে বকেয়া আদায়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। তাদের মতে, এতে রাজস্ব আদায়ে বাস্তব অগ্রগতি আসবে এবং কর ব্যবস্থার প্রতি আস্থাও বাড়বে।
এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মো. আবদুল মজিদ বলেন, “১০০ জন অল্প আয়ের করদাতার কাছ থেকে যে রাজস্ব আসে, তার চেয়ে বেশি আসে বড় করদাতাদের একজনের কাছ থেকে। বকেয়া রাজস্বের প্রায় সবই সম্পদশালীদের কাছে পাওনা। বছরের পর বছর এসব বকেয়া পড়ে আছে।”
তিনি আরও বলেন, চলতি অর্থবছরের ১১ মাস ইতোমধ্যে শেষের পথে। এ সময়ের মধ্যে বকেয়া এক লাখ কোটি টাকার সঙ্গে চলতি অর্থবছরের রাজস্ব ঘাটতি আরও প্রায় এক লাখ কোটি টাকা যোগ হয়েছে। তার মতে, বড় করদাতাদের কাছ থেকে কর আদায়ে জোর দিলে বকেয়া আদায় সম্ভব এবং রাজস্ব ঘাটতিও কমে আসবে।
এনবিআরের এই সাবেক চেয়ারম্যান আরও উল্লেখ করেন, অধিকাংশ ছোট করদাতা চাকরিজীবী এবং তারা নিয়ম অনুযায়ী বেতন থেকে কর পরিশোধ করেন। অন্যদিকে বড় করদাতাদের একটি অংশ নানা কৌশলে কর ফাঁকি দেন বলেও তিনি মন্তব্য করেন। তাই অল্প আয়ের করদাতাদের অডিটে বেশি সময় না দিয়ে বড় করদাতাদের ওপর নজর বাড়ানোর পরামর্শ দেন তিনি।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) পরিসংখ্যান বিভাগের তথ্য অনুযায়ী চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে (জুলাই–মার্চ) শুল্ক ও কর আদায়ে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৯৭ হাজার ৯৯০ কোটি টাকা। এপ্রিলে এসে এই ঘাটতি আরও বেড়ে এক লাখ কোটি টাকারও বেশি হয়েছে। একই সময়ে সবচেয়ে বেশি ঘাটতি দেখা গেছে আয়কর খাতে, যার পরিমাণ ৪০ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। গত অর্থবছরে এনবিআরের মোট রাজস্ব ঘাটতি ছিল ৯২ হাজার ৬২৬ কোটি টাকা। কিন্তু চলতি অর্থবছরের মাত্র ৯ মাসেই সেই অঙ্ক ছাড়িয়ে গেছে, যা রাজস্ব ব্যবস্থাপনার ওপর নতুন চাপ তৈরি করেছে।
এনবিআরের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বকেয়া রাজস্বের প্রায় ৯০ শতাংশই ধনী ব্যক্তি ও তাদের প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে পাওনা। এদের অনেকেই প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে চিহ্নিত। অভিযোগ রয়েছে, বারবার তাগিদ দেওয়ার পরও তারা বিভিন্ন অজুহাত বা কৌশলে কর পরিশোধ এড়িয়ে যাচ্ছেন।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, এসব বকেয়ার মধ্যে প্রায় ৫৫ শতাংশ ক্ষেত্রে করদাতারা কোনো অর্থ না দিয়েই মামলা করেছেন। ফলে এসব রাজস্ব আদায়ের প্রক্রিয়া বছরের পর বছর আটকে থাকছে। আবার প্রায় ৪০ থেকে ৪২ শতাংশ ক্ষেত্রে আংশিক পরিশোধ করে বাকি অংশ দীর্ঘ সময় ধরে ঝুলিয়ে রাখা হচ্ছে। বাকি ৩ থেকে ৫ শতাংশ ক্ষেত্রে করদাতারা সময়ক্ষেপণ করে যাচ্ছেন বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
এনবিআরের সাবেক সদস্য আমিনুল করিম বলেন, বড় করদাতাদের কাছ থেকে বকেয়া ও নিয়মিত কর আদায়ে আরও কঠোর অবস্থান নেওয়া প্রয়োজন। তার মতে, বড় করদাতারা নিয়মিত কর না দেওয়ায় বকেয়া ক্রমাগত বাড়ছে। তিনি আরও অভিযোগ করেন, কর কর্মকর্তারা আদায়ে গেলে অনেক সময় প্রভাবশালীদের চাপ ও হুমকির মুখেও পড়েন, এমনকি বদলির ঘটনাও ঘটে।
তিনি আরও বলেন, নিয়মিত কর প্রদানকারী অল্প আয়ের করদাতাদের অডিটে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হলে তারা ভোগান্তিতে পড়েন এবং এতে কর প্রদানে আগ্রহ কমে যেতে পারে। তার মতে, বড় করদাতাদের বকেয়া রাজস্ব আদায়ে এনবিআরের নজর আরও বাড়ানো উচিত।
এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, ২০২৩–২৪ করবর্ষের আয়কর রিটার্ন থেকে অডিট কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। প্রথম ধাপে ১৫ হাজার ৪৯৪টি এবং পরবর্তী ধাপে ৭২ হাজার ৩৪১টি রিটার্ন মিলিয়ে মোট ৮৭ হাজার ৮৩৫টি করদাতার রিটার্ন অডিটের জন্য নির্বাচন করা হয়েছে। প্রতিটি কর সার্কেল থেকে সর্বোচ্চ ২০০ এবং সর্বনিম্ন ২০টি রিটার্ন অডিটে নেওয়া হয়েছে। স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে নির্বাচিত এসব ই-টিআইএন নম্বরের তালিকা এনবিআরের ওয়েবসাইট (nbr.gov.bd)-এ প্রকাশ করা হয়েছে।

