মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবার দেশের বিদ্যুৎ খাতে সরাসরি প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির পর এবার বিদ্যুতের দাম সমন্বয়ের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
বিদ্যুৎ বিভাগের নীতিগত অনুমোদনের পর পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম ১৭ থেকে সর্বোচ্চ ২১ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। একই সঙ্গে পাইকারি দামের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে খুচরা পর্যায়েও আনুপাতিক হারে মূল্য বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়েছে।
এই প্রস্তাব বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) একটি কারিগরি কমিটি গঠন করেছে। বিইআরসি সূত্রে জানা যায়, গত মঙ্গলবার কমিশনের সভায় বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাবটি গ্রহণ করা হয়।
পিডিবির প্রস্তাব অনুযায়ী প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ১ টাকা ২০ পয়সা থেকে সর্বোচ্চ ১ টাকা ৫০ পয়সা পর্যন্ত বাড়তে পারে। বছরে প্রায় ৯ হাজার কোটি ইউনিট বিদ্যুৎ সরবরাহ করে পিডিবি। এই প্রস্তাব বাস্তবায়ন হলে প্রতি ইউনিটে দেড় টাকা বাড়লে বছরে প্রায় সাড়ে ১৩ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত আয় হবে। আর ১ টাকা ২০ পয়সা বাড়লে অতিরিক্ত আয় ১০ হাজার কোটি টাকার বেশি হতে পারে। পাইকারি পর্যায়ের এই মূল্যবৃদ্ধি খুচরা বাজারেও চাপ তৈরি করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এদিকে গত মঙ্গলবার (৫ মে) নর্দান ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানি (নেসকো) খুচরা পর্যায়ে আনুপাতিক হারে দাম বাড়ানোর প্রস্তাব বিইআরসিতে জমা দিয়েছে। একই সঙ্গে পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসি (পিজিসিবি) সঞ্চালন চার্জ প্রতি ইউনিটে ১৬ পয়সা বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে। বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিতরণ কোম্পানিগুলোর কাছে বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য এই চার্জ আদায় করা হয়।
পিডিবির তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট বিদ্যুৎ গ্রাহকের প্রায় ৬৩ শতাংশই স্বল্প ব্যবহারকারী, যারা মাসে ৭৫ ইউনিটের কম বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন। এ কারণে কম ব্যবহারকারীদের ওপর চাপ কম রেখে বেশি ব্যবহারকারীদের ক্ষেত্রে মূল্য সমন্বয়ের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এতে প্রায় ৩৭ শতাংশ গ্রাহকের বিল বাড়তে পারে বলে ধারণা দেওয়া হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে জ্বালানির দাম দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। এর ফলে দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় গত ১৮ এপ্রিল নির্বাহী আদেশে জ্বালানি তেলের দামও বাড়ানো হয়। এর আগে গত ৯ এপ্রিল বিদ্যুতের দাম পুনর্মূল্যায়নের জন্য অর্থমন্ত্রীকে আহ্বায়ক করে একটি উচ্চপর্যায়ের মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন করা হয়।
বিদ্যুৎ খাতের বর্তমান সংকট শুধু আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির কারণে নয়, বরং দীর্ঘদিনের নীতিগত দুর্বলতার ফলও। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, আগের সরকারের সময় বিশেষ ক্ষমতা আইনের আওতায় দরপত্র ছাড়াই একের পর এক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা হয়। এতে ক্যাপাসিটি পেমেন্টের বোঝা বেড়ে যায় এবং সরকারের ব্যয় বৃদ্ধি পায়। একই সঙ্গে জ্বালানি সংকটে অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র পুরো সক্ষমতায় চালানো সম্ভব হয়নি।
২০২২ সালের শেষ দিকে বিদ্যুতের দাম নির্ধারণের ক্ষমতা বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) কাছ থেকে সরকারের হাতে নেওয়া হয়। দেড় দশকে সরকার পাইকারি পর্যায়ে ১২ বার এবং খুচরা পর্যায়ে ১৪ বার বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েছে। পরে অন্তর্বর্তী সরকার ব্যয় কমানোর উদ্যোগ নেয় এবং কিছু ক্ষমতা আবার বিইআরসির হাতে ফিরিয়ে দেয়। তবে ব্যয় সংকোচন যথেষ্ট না হওয়ায় পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। গত অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি দাঁড়ায় রেকর্ড ৫৮ হাজার কোটি টাকায়।
পিডিবির চেয়ারম্যান মো. রেজাউল করিম বলেন, “এ বিষয়ে এখন প্রাথমিক কাজ চলছে। দু-একদিন সময় লাগবে। আমরা পেপারওয়ার্ক করছি। বিইআরসি একটি অবস্থানে এলে বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে।” তিনি আরও বলেন, বিষয়টি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে।
অন্যদিকে ভোক্তা অধিকার সংগঠনগুলো বলছে, দাম বাড়ানোর আগে অপচয় ও অনিয়ম কমানো জরুরি। তাদের মতে, ক্যাপাসিটি পেমেন্ট, সিস্টেম লস এবং উচ্চ ব্যয়ের চুক্তি পুনর্মূল্যায়ন না করলে এই চাপ শেষ পর্যন্ত সাধারণ গ্রাহকদের ওপরই পড়বে।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম বলেন, “ভর্তুকির অজুহাতে বারবার দাম বাড়ানো হচ্ছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনে বাড়তি খরচ কমানো গেলে ভর্তুকিও কমানো সম্ভব। এটি কোনো স্থায়ী সমাধান নয়।” তিনি আরও বলেন, উচ্চ ব্যয়ের কাঠামো ঠিক না করলে বারবার একই সমস্যার পুনরাবৃত্তি হবে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শুধু দাম বাড়ানো দিয়ে বিদ্যুৎ খাতের সংকট সমাধান সম্ভব নয়। উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থায় দক্ষতা বাড়ানো এবং ব্যয়বহুল বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর নির্ভরতা কমানো জরুরি।
বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন বলেন, “দাম সমন্বয় অনেক আগেই করা উচিত ছিল। দেরি করে বিষয়টি এখন চাপ তৈরি করেছে। তবে ভর্তুকি কমাতে দাম বাড়ানো বাস্তবতা।” তিনি আরও বলেন, বিদ্যুৎ ব্যবহারকারীরাই এই ভর্তুকির সুবিধাভোগী এবং একই সঙ্গে এর ব্যয় বহনকারী। তার মতে, ধীরে ধীরে কয়েক বছরে ধাপে ধাপে দাম সমন্বয় করা হলে চাপ কম হতো।
তার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বিদ্যুতের প্রকৃত উৎপাদন খরচ ও বিক্রয়মূল্যের ব্যবধান এখনো বড়, যা ভর্তুকির ওপর চাপ তৈরি করছে। তিনি বলেন, ক্যাপাসিটি চার্জ এবং অপচয় কমানো গেলে খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।

