সচিবালয়ে ২১ তলা বিশিষ্ট আধুনিক ভবন নির্মাণের যে প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছিল, তা জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদন পায়নি। প্রায় ৬৪৯ কোটি ২৫ লাখ ৫১ হাজার টাকার এই প্রকল্পটি চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হলেও শেষ পর্যন্ত তা ফিরিয়ে দেওয়া হয়।
এর ফলে নতুন করে সচিবালয় স্থানান্তরের বিষয়টি সামনে এসেছে। এখন শেরেবাংলা নগরে সচিবালয় সরিয়ে নেওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে কাজ চলছে। একই সঙ্গে পুরো প্রকল্পের নতুন নকশা তৈরির কাজও শুরু হয়েছে। এতে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে যানজট ব্যবস্থাপনা ও সামগ্রিক অবকাঠামোগত পরিকল্পনাকে। সূত্র জানায়, সরকারের উচ্চপর্যায়ের একাংশ সচিবালয়কে জাতীয় সংসদ ভবন ও এর আশপাশের এলাকায় স্থাপনের পক্ষে মত দিয়েছে। এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের স্থপতি লুই আই কানের নকশাকে ভিত্তি ধরে পরিকল্পনা এগিয়ে নেওয়ার আলোচনা রয়েছে।
বর্তমানে পুরান পল্টনের আব্দুল গণি সড়ক থেকে শেরেবাংলা নগরে সচিবালয় স্থানান্তর করা হলে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে, তা বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করছে সরকার। আগারগাঁও ও শেরেবাংলা নগর এলাকায় ইতোমধ্যে একাধিক সরকারি অফিস থাকায় নতুন করে চাপ সৃষ্টি হবে কি না—সেই বিষয়টিও বিশ্লেষণে রয়েছে। স্থাপত্য অধিদপ্তর এসব দিক বিবেচনায় রেখে নকশার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। তবে এখনো চূড়ান্ত কোনো নকশা অনুমোদিত হয়নি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
স্থাপত্য অধিদপ্তরের প্রধান স্থপতি মো. আসিফুর রহমান ভূঁইয়া বলেন, শেরেবাংলা নগরে সচিবালয় স্থানান্তরের বিষয়টি মাথায় রেখে পরিকল্পনা এগোচ্ছে। সাবেক বাণিজ্যমেলার খেলার মাঠসহ সম্ভাব্য স্থানগুলো পরিদর্শন করা হয়েছে। তিনি জানান, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী ও সচিবদের অনুমোদনের পরই বিষয়টি চূড়ান্ত হবে। একই সঙ্গে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও অন্যান্য দিকও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
প্রকল্পটি নিয়ে গত ২৬ এপ্রিল একনেক সভায় আলোচনা হয়। ওই সভায় সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী ও একনেক সভাপতি তারেক রহমান। সভায় প্রকল্পটি উপস্থাপন করা হলেও শেষ পর্যন্ত অনুমোদন মেলেনি। সভায় অংশ নেওয়া কয়েকজন নীতিনির্ধারক সচিবালয় ও সংসদ ভবনকে কাছাকাছি রাখার পক্ষে মত দেন। পাশাপাশি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ শেরেবাংলা নগরে সচিবালয় স্থাপনের ক্ষেত্রে যানজট পরিস্থিতি গুরুত্ব দিয়ে পর্যালোচনার পরামর্শ দেন।
এদিকে সরকারের উচ্চপর্যায়ে লুই আই কানের নকশা অনুযায়ী শেরেবাংলা নগরে নতুন সচিবালয় গড়ে তোলার সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের নির্দেশনাও এসেছে বলে জানা গেছে।
এ প্রসঙ্গে একনেক সভায় উপস্থিত এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, পুরোনো ও অব্যবহৃত ভবন বেড়ে যাওয়ায় সচিবালয় পুনর্বিন্যাসের বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। শেরেবাংলা নগরে স্থানান্তরের সম্ভাবনাও গুরুত্ব পাচ্ছে। তিনি আরও জানান, সংসদ ও সচিবালয়কে পাশাপাশি রাখার বিষয়ে একটি পক্ষ মত দিয়েছে, আবার অন্যদিকে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও নগর পরিকল্পনার বিষয়টিও সমান গুরুত্ব পাচ্ছে।
রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলার মাঠে সচিবালয় স্থানান্তরের আলোচনা শুরু হয়েছিল প্রায় ১১ বছর আগে। দেশের প্রধান প্রশাসনিক কেন্দ্র সরিয়ে নেওয়ার এই পরিকল্পনা প্রথম বড় আকারে উঠে আসে ২০১৫ সালের ১২ অক্টোবর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে।
সে সময় নতুন সচিবালয় নির্মাণ প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছিল ২ হাজার ২০৯ কোটি ৭০ লাখ টাকা। পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০১৮ সালের জুনের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। প্রকল্পটি সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়নের কথাও বলা হয়েছিল। তবে নানা কারণে প্রকল্পটি তখন থেকেই আটকে যায়। প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনের কাছাকাছি অবস্থান, সম্ভাব্য নিরাপত্তা ঝুঁকি, যানজটের আশঙ্কা এবং অর্থায়ন সংক্রান্ত জটিলতাকে প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হয়। ফলে প্রকল্পটি দীর্ঘদিন একনেকের আলোচনায়ও ওঠেনি। পরে কয়েক দফা চেষ্টা হলেও প্রকল্পটি অনুমোদন পায়নি। স্থপতি লুই আই কানের নকশার ভিত্তিতে বাস্তবায়নের বিষয়ে আগের সরকারের সময় একটি নীতিগত আগ্রহ থাকলেও শেষ পর্যন্ত তা বাস্তব রূপ নেয়নি।
প্রস্তাবিত নকশা অনুযায়ী, প্রায় ৩২ একর জমিকে চারটি ব্লকে ভাগ করে একটি আধুনিক সচিবালয় কমপ্লেক্স নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল। এর মধ্যে দুটি বড় ব্লকে ৩২টি বড় মন্ত্রণালয় এবং দুটি ছোট ব্লকে ১৬টি ছোট মন্ত্রণালয় রাখার কথা ছিল। পাশাপাশি অডিটোরিয়াম, সম্মেলন কেন্দ্র, ব্যাংক, পোস্ট অফিস, ক্যাফেটেরিয়া এবং ৯৪৬টি গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থাও পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত ছিল।
তবে প্রকল্পটি নিয়ে তখনই বিভিন্ন পক্ষের আপত্তি ছিল। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) তাদের মতামতে বলেছিল, বর্তমান সচিবালয়ের আশপাশে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ কঠিন হলেও শেরেবাংলা নগর এলাকায় রাস্তার ঘাটতি থাকায় সেখানে যান চলাচল আরও জটিল হতে পারে। পাশাপাশি গণভবন ও প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয়েছিল। তৎকালীন সময়ে নিরাপত্তা ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে প্রকল্পটি বারবার পিছিয়ে যায়। পরে আরও কয়েকবার একনেক সভায় উপস্থাপন করা হলেও অনুমোদন মেলেনি।
বর্তমান পরিস্থিতিতে বিষয়টি আবার নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বিশেষ করে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের পর শেরেবাংলা নগরে সচিবালয় স্থানান্তরের ধারণাটি পুনরায় গুরুত্ব পাচ্ছে। ৫ আগস্টের পর গণভবনকে জাদুঘরে রূপান্তরের সিদ্ধান্তের কারণে আগের কিছু নিরাপত্তা-সংক্রান্ত আপত্তিও আর প্রযোজ্য থাকছে না বলে আলোচনা চলছে।
এদিকে গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী (প্রকল্প বিভাগ-২) আব্দুল্লাহ মুহম্মদ জুবাইর বলেন, “সচিবালয় স্থানান্তর নিয়ে স্থাপত্য অধিদপ্তর কাজ করছে। তবে এখনো কোনো লিখিত প্রস্তাব পাওয়া যায়নি। আমরা কেবল আলোচনা শুনছি।”
২১ তলা ভবন প্রকল্পে কী ছিল:
সচিবালয়ে ২১ তলা বিশিষ্ট আধুনিক ভবন নির্মাণের প্রস্তাবিত প্রকল্পটি দ্বিতীয় দফায়ও জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) অনুমোদন পায়নি। প্রকল্পটি মূলত পল্টন থেকে আগারগাঁও এলাকায় সচিবালয় স্থানান্তরের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল।
প্রায় ৬৪৯ কোটি ২৫ লাখ ৫১ হাজার টাকা ব্যয়ে এই প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রস্তাব দেওয়া হয়। এর প্রধান লক্ষ্য ছিল সচিবালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রমের কেন্দ্রস্থলে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য একটি আধুনিক ও সুশৃঙ্খল কর্মপরিবেশ তৈরি করা। প্রকল্প প্রস্তাবে বলা হয়, বর্তমান চাহিদা অনুযায়ী সচিবালয়ে মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোর স্থান সংকুলান একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই সমস্যা সমাধান, জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং সরকারি অর্থের কার্যকর ব্যবহারের লক্ষ্যেই নতুন ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল।
প্রস্তাবিত নকশা অনুযায়ী, ২১ তলা একটি ভবন নির্মাণের কথা ছিল, যার সঙ্গে চারটি বেজমেন্ট যুক্ত থাকবে। ভবনটি আধুনিক সুপার স্ট্রাকচার ও শক্তিশালী ভিত্তির ওপর নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়। অবকাঠামোতে অভ্যন্তরীণ পানি সরবরাহ, পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা, আধুনিক বিদ্যুৎ সংযোগ, গ্যাস লাইন এবং ভূগর্ভস্থ জলাধার রাখার পরিকল্পনাও ছিল। পাশাপাশি ভবনে দুটি সাব-স্টেশন, জেনারেটর ব্যবস্থা এবং উন্নত শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা স্থাপনের কথা ছিল।
যাতায়াত ব্যবস্থার সুবিধার্থে ছয় সেট প্যাসেঞ্জার লিফট, ছয় সেট ফায়ার লিফট এবং দুটি বেড লিফট স্থাপনের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। নিরাপত্তা ও কার্যপরিবেশ উন্নত করতে অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা, আধুনিক কনফারেন্স সিস্টেম এবং ২০টি কনফারেন্স রুম নির্মাণের প্রস্তাবও ছিল প্রকল্পে।
পরিকল্পনা বিভাগের পর্যালোচনায় উল্লেখ করা হয়, সচিবালয় দেশের প্রশাসনিক কেন্দ্র হওয়ায় এখানে প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক সরকারি কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি, বিদেশি প্রতিনিধি, উন্নয়ন সহযোগী এবং সাধারণ মানুষের যাতায়াত ঘটে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে অতিরিক্ত দুই লাখ ৮৭ হাজার ৬৩৬ বর্গফুট জায়গা যুক্ত হওয়ার কথা ছিল, যা বর্তমান চাহিদার প্রায় ৪২ দশমিক ৩০ শতাংশ পূরণ করতে সক্ষম হতো বলে প্রস্তাবে বলা হয়।
এ বিষয়ে গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী (প্রকল্প বিভাগ-২) আব্দুল্লাহ মুহম্মদ জুবাইর বলেন, স্থাপত্য অধিদপ্তর সচিবালয় স্থানান্তর নিয়ে কাজ করছে, তবে এখনো কোনো লিখিত প্রস্তাব পাওয়া যায়নি। তিনি আরও বলেন, “২১ তলা ভবন নির্মাণ প্রকল্পটি একনেক সভায় অনুমোদন পায়নি। শেরেবাংলা নগরে নতুন সচিবালয় নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

