প্রতি অর্থবছরের উন্নয়ন বাজেটে একটি অংশ ‘থোক বরাদ্দ’ হিসেবে সংরক্ষণ করা হয়। মূলত জরুরি পরিস্থিতি মোকাবেলায় দ্রুত ব্যয়ের সুযোগ রাখতেই এ ধরনের বরাদ্দ রাখা হয় কিন্তু বাস্তবে বহু বছর ধরেই দেখা যাচ্ছে, সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও জবাবদিহিতার অভাবে এই বরাদ্দের অর্থ অনেক সময় যথাযথভাবে ব্যবহৃত হয় না। বরং নানা ক্ষেত্রে এটি অপচয়, অস্বচ্ছতা ও অনিয়মের অভিযোগের জন্ম দেয়।
অভিযোগ রয়েছে, জরুরি প্রয়োজন না থাকলেও বিভিন্ন সুপারিশ ও প্রশাসনিক বিবেচনায় থোক বরাদ্দের অর্থ খরচ করা হয়। এর অন্যতম কারণ, মূল বাজেট কাঠামোতে এ অর্থ কোথায় এবং কীভাবে ব্যয় হবে, তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকে না। ফলে বরাদ্দের একটি বড় অংশ কার্যত অনির্ধারিত অবস্থায় থেকে যায়। এরপরও প্রতি বছর থোক বরাদ্দের পরিমাণ বাড়ানো হচ্ছে, যা বাজেট ব্যবস্থাপনার একটি দুর্বলতা হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
আসন্ন অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) ঘিরেও একই প্রশ্ন উঠেছে। অর্থ মন্ত্রণালয় আগামী অর্থবছরের জন্য ৩ লাখ কোটি টাকার উন্নয়ন বাজেট প্রস্তাব করেছে। এর মধ্যে ২ লাখ ২৬ হাজার কোটি টাকা উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয়ের জন্য নির্ধারণ করা হলেও বাকি ৭৪ হাজার কোটি টাকা বিশেষ প্রয়োজনে উন্নয়ন সহায়তা ও সামাজিক উন্নয়ন সহায়তা খাতে থোক বরাদ্দ হিসেবে রাখার প্রস্তাব রয়েছে। শিগগিরই জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের সভায় এটি অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হতে পারে বলে জানা গেছে।
এ প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে উন্নয়ন বাজেটের প্রায় এক-চতুর্থাংশ অনির্দিষ্ট খাতে সংরক্ষিত থাকবে। অর্থাৎ বিপুল পরিমাণ অর্থের ব্যয়ের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা শুরুতেই নির্ধারিত থাকবে না। এমন পরিস্থিতিতে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—এই অর্থ কীভাবে ব্যয় হবে, কার সিদ্ধান্তে হবে এবং সেই ব্যয়ে কতটা জবাবদিহিতা থাকবে?
বিশেষজ্ঞদের অনেকে মনে করেন, থোক বরাদ্দের পরিমাণ যত বাড়ে, ততই ইচ্ছামাফিক ব্যয়ের ঝুঁকি তৈরি হয়। রাজনৈতিক বিবেচনা কিংবা ব্যক্তিগত পছন্দের ভিত্তিতেও প্রকল্পে অর্থ বরাদ্দের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। অতীতের বাজেট বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতাও এ শঙ্কাকে পুরোপুরি অমূলক বলে মনে করার সুযোগ দেয় না। বিভিন্ন সময়ে থোক বরাদ্দ থেকে এমন খাতে অর্থ স্থানান্তরের অভিযোগ উঠেছে, যেগুলো মূল বাজেটে থাকলে সংসদীয় আলোচনা ও প্রশ্নের মুখে পড়তে পারত। ফলে থোক বরাদ্দ অনেক সময় বিতর্ক এড়ানোর একটি বিকল্প পথ হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছে বলে সমালোচনা রয়েছে।
অর্থনীতিবিদরা অবশ্য থোক বরাদ্দের প্রয়োজনীয়তা পুরোপুরি অস্বীকার করেন না। তাদের মতে, রাষ্ট্র পরিচালনায় অনেক সময় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়, যা আগেভাগে নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। করোনা মহামারী তার বড় উদাহরণ। এছাড়া আকস্মিক বন্যা, অতিবৃষ্টি, খরা বা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটের মতো পরিস্থিতিতে সরকারকে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হয়। সেজন্য বাজেটে কিছু অনির্ধারিত তহবিল রাখা যৌক্তিক। তবে সমস্যা তৈরি হয় তখনই, যখন সেই বরাদ্দের পরিমাণ অত্যধিক হয়ে যায় এবং ব্যয়ের স্পষ্ট নীতিমালা অনুপস্থিত থাকে।
স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতের প্রস্তাবিত বরাদ্দ বিশ্লেষণ করলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হয়। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের চলমান উন্নয়ন প্রকল্পে বরাদ্দ রাখা হয়েছে মাত্র ৬ হাজার ৮ কোটি টাকা। অথচ একই খাতে থোক বরাদ্দের প্রস্তাব ২০ হাজার ৮০০ কোটি টাকা, যা চলমান প্রকল্প বরাদ্দের কয়েক গুণ বেশি। একই চিত্র প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়েও। সেখানে চলমান প্রকল্পে বরাদ্দ ৫ হাজার কোটির কিছু বেশি হলেও থোক বরাদ্দের প্রস্তাব ১৬ হাজার কোটিরও বেশি।
এ ধরনের অনুপাত স্বাভাবিক নয় বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, চলমান প্রকল্পের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি অর্থ অনির্দিষ্টভাবে রেখে দিলে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা দুর্বল হয়ে পড়ে। বিশেষ করে যখন এডিপি বাস্তবায়ন নিজেই ধীরগতির, তখন এত বড় অঙ্কের থোক বরাদ্দের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতের অনেক প্রকল্পে বরাদ্দকৃত অর্থ সময়মতো ব্যয় না হওয়ার অভিযোগও রয়েছে। ফলে নতুন করে বিপুল পরিমাণ অনির্ধারিত অর্থ সংরক্ষণের যৌক্তিকতা নিয়ে আলোচনা প্রয়োজন।
সরকারের পক্ষ থেকে স্বাস্থ্য খাতে বড় নিয়োগ এবং কারিগরি শিক্ষায় বিনিয়োগ পরিকল্পনার কথাও বলা হচ্ছে। ভবিষ্যতে এসব কর্মসূচির জন্য বড় অঙ্কের অর্থ প্রয়োজন হতে পারে—এ যুক্তিতে থোক বরাদ্দ বাড়ানোর পক্ষে মত দেয়া হচ্ছে। তবে বিশ্লেষকদের ভাষ্য, নতুন সরকার সব পরিকল্পনা শুরুতেই পূর্ণাঙ্গভাবে প্রস্তুত করতে না পারলেও তার অর্থ এই নয় যে বিপুল পরিমাণ অর্থ অনির্দিষ্টভাবে রেখে দিতে হবে। বরং এতে বাজেট ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা ও অদক্ষতার বিষয়টি সামনে আসে।
মনে রাখা জরুরি, উন্নয়ন বাজেটের অর্থ কেবল সংখ্যার হিসাব নয়। এই অর্থ আসে জনগণের কর, রাষ্ট্রীয় রাজস্ব এবং বিদেশী ঋণ ও সহায়তা থেকে। ফলে এ অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। কিন্তু থোক বরাদ্দের ক্ষেত্রে সেই জবাবদিহিতার কাঠামো এখনো যথেষ্ট শক্তিশালী নয় বলেই মত বিশেষজ্ঞদের।
তাদের মতে, উন্নয়ন বাজেটের ১০ থেকে ১৫ শতাংশের বেশি থোক বরাদ্দ রাখা সুশাসনের নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। অথচ চলতি অর্থবছরে যেখানে থোক বরাদ্দ ছিল এডিপির প্রায় ৮ শতাংশ, সেখানে আগামী বাজেটে সেটি বাড়িয়ে ২৪ শতাংশ করার প্রস্তাব এসেছে। এ প্রবণতা উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠছে।
উন্নয়ন বাজেট চূড়ান্ত করার আগে তাই থোক বরাদ্দের পরিমাণ ও ব্যয়ের কাঠামো নতুন করে পর্যালোচনা করা জরুরি। অর্থনৈতিক চাপের এই সময়ে প্রতিটি টাকার ব্যবহারে স্বচ্ছতা, দক্ষতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার। সূত্র: বণিক বার্তা

