নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু হওয়ার পর বইয়ের জন্য অপেক্ষা করতে হবে না এমন লক্ষ্য নিয়ে এবার আগেভাগেই মাঠে নামছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের বিনা মূল্যের পাঠ্যবই ডিসেম্বরেই শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। এর পেছনে শুধু সময়ের আগে বই দেওয়া নয়, গত দুই বছরে তৈরি হওয়া বই সরবরাহের সংকট থেকে বেরিয়ে আসার চাপও কাজ করছে।
গত কয়েক বছরে শিক্ষাবর্ষের প্রথম দিনেই সব শিক্ষার্থীর হাতে বই পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য বারবার ধাক্কা খেয়েছে। ২০২৫ শিক্ষাবর্ষে বই সরবরাহ পুরোপুরি শেষ হতে প্রায় তিন মাস লেগেছিল। চলতি ২০২৬ শিক্ষাবর্ষেও শতভাগ বই পৌঁছাতে ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত সময় লেগেছে। ফলে বছরের শুরুতেই অনেক শিক্ষার্থী পূর্ণ সেট বই না পাওয়ায় শ্রেণিকক্ষের স্বাভাবিক পাঠদান ব্যাহত হয়েছে। এবার সেই অভিজ্ঞতা থেকে সময়সূচিটাই বদলে দিতে চাইছে সরকার। এনসিটিবির পরিকল্পনা হলো, ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের সব বই ৩০ নভেম্বরের মধ্যে উপজেলা পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়া, যাতে বার্ষিক পরীক্ষা শেষ হওয়ার পরপরই শিক্ষার্থীদের হাতে বই তুলে দেওয়া যায়।
বই দেরি হওয়ার পেছনে শুধু ছাপাখানা দায়ী নয়
বিষয়টি শুনতে সহজ হলেও বাস্তবে প্রায় ৩১ কোটি বই ছাপানো ও সারা দেশে পৌঁছে দেওয়া বড় ধরনের সরবরাহ ব্যবস্থাপনার কাজ। কাগজ সংগ্রহ, দরপত্র, পাণ্ডুলিপি চূড়ান্ত করা, সম্পাদনা, মুদ্রণ, মান যাচাই এবং দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে পরিবহন প্রতিটি ধাপ ঠিক সময়ে শেষ না হলে পুরো প্রক্রিয়ায় প্রভাব পড়ে। আগের বছরগুলোতে এসব ধাপের একাধিক জায়গায় বিলম্ব হয়েছে। ২০২৫ শিক্ষাবর্ষের বইয়ের ক্ষেত্রে পাণ্ডুলিপি পরিবর্তন, নতুন করে দরপত্রসহ প্রশাসনিক ও মুদ্রণসংক্রান্ত জটিলতাও সময়সূচিকে পিছিয়ে দিয়েছিল।
এবার তাই শুধু ‘বই ছাপা’ নয়, পুরো সরবরাহ প্রক্রিয়াকে কয়েক মাস এগিয়ে আনার চেষ্টা হচ্ছে। এনসিটিবি জানিয়েছে, ২০২৭ সালের বইয়ের পরিমার্জন ও প্রস্তুতিমূলক কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে, যাতে নভেম্বরের মধ্যেই মাঠপর্যায়ে বই পাঠানো সম্ভব হয়। অর্থাৎ ডিসেম্বরের বই দেওয়ার পরিকল্পনা সফল করতে আসলে নভেম্বরের মধ্যেই সবচেয়ে কঠিন কাজ শেষ করতে হবে। এখানে সামান্য বিলম্বও পুরো পরিকল্পনাকে আবার জানুয়ারিকেন্দ্রিক করে দিতে পারে।
নতুন বইয়ের সঙ্গে বদলাবে শেখার ধরনও
২০২৭ শিক্ষাবর্ষে শুধু পুরোনো বই নতুন করে ছাপানো হচ্ছে না; চতুর্থ ও ষষ্ঠ শ্রেণিতে চারটি নতুন বই যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চতুর্থ শ্রেণিতে থাকবে ‘খেলাধুলা’ ও ‘বাংলাদেশের সংস্কৃতি’, আর ষষ্ঠ শ্রেণিতে যুক্ত হবে ‘আনন্দময় শিখন’ এবং ‘আমার কারিগরি শিক্ষা’। এসব বইয়ের লক্ষ্য হলো শিক্ষার্থীদের শুধু পরীক্ষামুখী পড়াশোনায় আটকে না রেখে খেলাধুলা, সংস্কৃতি, সৃজনশীলতা এবং কারিগরি শিক্ষার সঙ্গে পরিচিত করা।
এই পরিবর্তনের পেছনে একটি বড় প্রশ্ন আছে শিক্ষার্থী ভবিষ্যতে কী ধরনের দক্ষতা নিয়ে স্কুল থেকে বের হবে? ‘আমার কারিগরি শিক্ষা’ বইয়ের মাধ্যমে ছোটবেলা থেকেই কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার প্রতি আগ্রহ তৈরি করার চেষ্টা করা হচ্ছে। অন্যদিকে ‘খেলাধুলা’ ও ‘আনন্দময় শিখন’ ধরনের বইয়ের মাধ্যমে শারীরিক কার্যক্রম, সৃজনশীলতা ও আনন্দের সঙ্গে শেখাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এনসিটিবির পরিকল্পনায় ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণির তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বইতেও এআই, রোবোটিক্স, সাইবার নিরাপত্তা ও মিডিয়া লিটারেসির মতো আধুনিক বিষয় যুক্ত করার উদ্যোগের কথা এসেছে।
২০২৭ কি শুধু প্রস্তুতির বছর?
পাঠ্যবইয়ের এই পরিবর্তনকে আলাদা কোনো উদ্যোগ হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি ধরা যাবে না। এনসিটিবি ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনায় ২০২৭ সালকে মূলত পরিমার্জনের বছর হিসেবে দেখা হচ্ছে, আর ২০২৮ সাল থেকে আরও বড় পরিসরে শিক্ষাক্রম পরিবর্তনের প্রস্তুতি চলছে। এনসিটিবি চেয়ারম্যানের বক্তব্য অনুযায়ী, ২০২৮ সালে বড় ধরনের পরিবর্তন এমনকি একটি পূর্ণাঙ্গ নতুন শিক্ষাক্রমের রূপও নিতে পারে।
অর্থাৎ আগামী বছরের বইগুলো একদিকে বর্তমান শিক্ষাক্রমের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সংশোধিত হবে, অন্যদিকে ভবিষ্যতের বড় পরিবর্তনের জন্যও জায়গা তৈরি করবে। এ কারণে এবার বইয়ের সময়মতো সরবরাহের পাশাপাশি বিষয়বস্তুর মান, তথ্যের নির্ভুলতা এবং শিক্ষার্থীর বয়স ও শেখার সক্ষমতার সঙ্গে বইয়ের সামঞ্জস্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। কারণ বই হাতে পৌঁছালেই কাজ শেষ নয়; বইটি শিক্ষার্থীর শেখার জন্য কতটা কার্যকর, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সবশেষে ডিসেম্বরেই বই দেওয়ার পরিকল্পনাটি সফল হলে এর সবচেয়ে বড় সুবিধা হবে শিক্ষাবর্ষের শুরুতে অনিশ্চয়তা কমে যাওয়া। শিক্ষার্থী বই নিয়ে অপেক্ষা করবে না, শিক্ষকও অসম্পূর্ণ বই নিয়ে ক্লাস নেওয়ার সমস্যায় পড়বেন না। কিন্তু এই পরিকল্পনার আসল পরীক্ষা হবে মুদ্রণ শেষ করার পর দেশের প্রতিটি উপজেলা, দুর্গম এলাকা ও প্রান্তিক শিক্ষার্থীর হাতে নির্ধারিত সময়ে পুরো সেট বই পৌঁছানো যায় কি না। গত কয়েক বছরের অভিজ্ঞতা বলছে, ঘোষণা করা সহজ; কয়েক কোটি বইয়ের এত বড় সরবরাহ ব্যবস্থা নির্ভুলভাবে পরিচালনা করাই আসল চ্যালেঞ্জ। এবার সেই চ্যালেঞ্জে সরকার কতটা সফল হয়, সেটিই ঠিক করবে ডিসেম্বরের পরিকল্পনা সত্যিই নতুন একটি নিয়মে পরিণত হবে, নাকি আবারও বই পৌঁছানোর অপেক্ষা করতে হবে নতুন বছরের শুরু পর্যন্ত।

