সন্ধ্যা নামলেই আজকের ঢাকা যেন আলোর সাগরে রূপ নেয়। বিমানবন্দর সড়ক থেকে হাতিরঝিল, বিজয় সরণি থেকে মেয়র হানিফ ফ্লাইওভার—চোখ যেদিকেই যাক, সারি সারি উজ্জ্বল এলইডি বাতি জানান দেয়, এই শহর যেন কখনো ঘুমায় না। কিন্তু দেড়শ বছর আগেও ঢাকার চিত্র ছিল একেবারেই ভিন্ন।
সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গেই দিনভর কোলাহলমুখর এই নগরী তলিয়ে যেত ঘন অন্ধকারে। সাধারণ মানুষের একমাত্র ভরসা ছিল কুপিবাতি, মোমবাতি বা হারিকেন, আর ধনী পরিবারের ঘরেই কেবল দেখা মিলত ঝাড়বাতির আলোর। এই অন্ধকার নগরী কীভাবে ধাপে ধাপে আলোকিত হয়ে উঠল, সেই দীর্ঘ যাত্রার গল্পই তুলে ধরা হলো এখানে।
শুরুর দিকে কেরোসিনের আলো ও বাতিওয়ালাদের কথা: ঢাকার সড়কে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে আলো জ্বালানোর সূচনা ঘটে ঊনবিংশ শতাব্দীর সাতের দশকের শেষভাগে। তৎকালীন প্রশাসনের এক ম্যাজিস্ট্রেটের নির্দেশে একজন সিভিল সার্জন নগরীকে আধুনিকায়নের যে প্রস্তাব দেন, তাতে কেরোসিন বাতি স্থাপনের কথাও ছিল।
এরপর ব্রিটিশ রানিকে ভারতসম্রাজ্ঞী ঘোষণা করার স্মারক হিসেবে পুরান ঢাকার একটি নির্দিষ্ট এলাকা থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত প্রথমবারের মতো বসানো হয় ৬০টি কেরোসিন ল্যাম্পপোস্ট।
সে সময় সন্ধ্যা হলেই দেখা যেত এক অভিনব দৃশ্য—মই আর তেলের পাত্র নিয়ে একদল মানুষ ছুটে বেড়াতেন ল্যাম্পপোস্টগুলোর কাছে। তারা প্রতিটি বাতিতে কেরোসিন ঢেলে আলো জ্বালিয়ে দিতেন, আবার ভোর হতেই সেগুলো নিভিয়ে দিতেন। এই মানুষদের বলা হতো ‘বাতিওয়ালা’। তবে ঝড়-বৃষ্টি বা প্রবল বাতাসে প্রায়ই সেই বাতি নিভে যেত, আর নগরী ফিরে যেত পুরনো অন্ধকারেই।
নবাবের অঙ্গীকার এবং গ্যাসবাতির অসমাপ্ত অধ্যায়: কেরোসিনের বদলে গ্যাসবাতি চালুর প্রথম উদ্যোগ নেন ঢাকার নওয়াব পরিবারের একজন সদস্য, নবাব আহসানউল্লাহ। ঊনবিংশ শতাব্দীর আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে তার পিতা ব্রিটিশ সরকারের কাছ থেকে একটি সম্মানসূচক উপাধি লাভ করেন। বাবার এই সম্মানকে স্মরণীয় করে রাখতে নবাব আহসানউল্লাহ নিজ খরচে ঢাকার প্রধান সড়কগুলোতে গ্যাসবাতি স্থাপনের ঘোষণা দেন।
তবে প্রশাসনিক জটিলতায় এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হতে গড়িয়ে যায় এক যুগেরও বেশি সময়। এমনকি তৎকালীন ভাইসরয় স্বয়ং ঢাকা সফরে এসে এই বিষয়ে তাগাদা দিলেও কাজের গতি তেমন বাড়েনি।
গ্যাস নয়, সরাসরি এল বৈদ্যুতিক আলো: তবে প্রতিশ্রুতি ভাঙার মানুষ ছিলেন না নবাব আহসানউল্লাহ। গ্যাসবাতির পরিকল্পনা যখন আটকে ছিল প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতায়, ততদিনে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে বৈদ্যুতিক আলো। তখন তিনি সিদ্ধান্ত নেন, গ্যাস নয়, ঢাকাবাসীকে সরাসরি বৈদ্যুতিক আলোর মাধ্যমেই চমকে দেবেন।
এই লক্ষ্যে তিনি একটি ট্রাস্ট গঠন করেন এবং সে যুগের হিসাবে বিপুল অঙ্কের অর্থ অনুদান হিসেবে প্রদান করেন। বিদ্যুৎ উৎপাদনের দায়িত্ব দেওয়া হয় একটি ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠানকে, আর বিদ্যুৎকেন্দ্রটি স্থাপন করা হয় বর্তমান হাতিরপুল এলাকার কাছাকাছি একটি স্থানে।
অবশেষে বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে এক শীতের সন্ধ্যায়, নবাব পরিবারের এক বিবাহ অনুষ্ঠান উপলক্ষে আহসান মঞ্জিলে বসেছিল জমকালো এক আয়োজন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত এক ঊর্ধ্বতন ব্রিটিশ কর্মকর্তা সুইচ টিপতেই মুহূর্তেই আলোকিত হয়ে ওঠে গোটা আহসান মঞ্জিল এবং ঢাকার প্রধান প্রধান সড়ক। তেল বা গ্যাস ছাড়াই এমন চোখ ধাঁধানো আলো দেখে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যান নগরবাসী। পরদিন স্থানীয় একটি পত্রিকায় এই ঘটনাকে অত্যন্ত আবেগঘন ভাষায় তুলে ধরা হয়। তবে এই ঐতিহাসিক মুহূর্তের মাত্র কয়েকদিন পরেই মৃত্যুবরণ করেন নবাব আহসানউল্লাহ।
ধাপে ধাপে বদলে যাওয়া নগর-আলো: বিংশ শতাব্দীর শুরুতে বিদ্যুৎ ছিল কেবল অভিজাত শ্রেণির প্রতীক। শুরুতে পুরান ঢাকার হাতেগোনা কয়েকটি এলাকা ও সড়কেই সীমাবদ্ধ ছিল এই আলো। সাধারণ মানুষের ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছাতে সময় লেগেছিল আরও বহু বছর। ত্রিশের দশকের এক পরিসংখ্যান বলছে, তখনো ঢাকায় হাজারের বেশি বৈদ্যুতিক বাতির পাশাপাশি সাড়ে আটশর মতো কেরোসিন বাতিও চালু ছিল।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ছোট ছোট পাওয়ার হাউস থেকে ছড়িয়ে পড়া সেই বিদ্যুৎ আজ কোটি মানুষের এই নগরীকে দিনরাত সচল রাখছে। আশির দশকের রাস্তার পরিচিত হলুদ আলোর সোডিয়াম বাতির যুগ পেরিয়ে ঢাকা আজ পৌঁছে গেছে হ্যালোজেন হয়ে বর্তমানের ঝলমলে এলইডি আলোর যুগে।
আজ রাতের ঢাকাকে উঁচু থেকে দেখলে মনে হয় যেন এক আলোর সাগর। কিন্তু এই ঝলমলে আলোর প্রতিটি বাতির আড়ালে লুকিয়ে আছে শতবর্ষেরও পুরোনো এক ইতিহাস, যা একটি নগরীর ধীরে ধীরে আধুনিক হয়ে ওঠার সাক্ষী হয়ে আছে।

