বাংলাদেশের আর্থিক খাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হিসেবে বীমা শিল্পের ভূমিকা হওয়ার কথা ছিল মানুষের ঝুঁকি কমানো, ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা জোরদার করা। কিন্তু বাস্তবতা আজ একেবারেই ভিন্ন। শতকোটি টাকার আত্মসাৎ, দীর্ঘসূত্রতায় আটকে থাকা দাবি নিষ্পত্তি, দুর্বল তদারকি এবং নীতিগত অসংগতি—সব মিলিয়ে এই খাত এখন আস্থার গভীর সংকটে নিমজ্জিত।
একসময় যে বীমা ছিল নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি, তা এখন অনেক ক্ষেত্রেই পরিণত হয়েছে অনিশ্চয়তার প্রতীকে। গ্রাহকের প্রিমিয়ামের অর্থ কোথায় যাচ্ছে, কেন দাবি সময়মতো পরিশোধ হচ্ছে না, এবং কেন অনিয়মের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেই—এসব প্রশ্ন ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। অথচ এই সংকটের মধ্যেও নীতিনির্ধারক ও নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএ (Insurance Development and Regulatory Authority of Bangladesh)-এর ভূমিকা নিয়ে রয়েছে বিস্তর সমালোচনা; অভিযোগ উঠছে নীরবতা, অদক্ষতা এবং দায় এড়ানোর প্রবণতার।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে বীমা খাতের এই চিত্র কেবল একটি খাতের দুর্বলতার প্রতিফলন নয়; বরং এটি আর্থিক শাসনব্যবস্থার গভীরতর সংকটের ইঙ্গিত বহন করে। আস্থাহীনতা, অনিয়ম এবং জবাবদিহিতার অভাবের প্রভাব পড়ছে শুধু গ্রাহকের ওপর নয়, বরং পুরো অর্থনীতির স্থিতিশীলতার ওপরই।
বাংলাদেশের বীমা খাত ক্রমেই উদ্বেগজনক অবস্থায় পৌঁছেছে। শতকোটি টাকার আত্মসাৎ, দাবি নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা এবং নানা অনিয়মের কারণে খাতটি নাজুক হয়ে পড়েছে। যেসব প্রতিষ্ঠানের ওপর মানুষের আর্থিক নিরাপত্তা নির্ভর করার কথা, সেগুলোর বিরুদ্ধেই তহবিল তছরুপ ও অব্যবস্থাপনার অভিযোগ উঠছে।
পদ্মা লাইফ, বায়রা লাইফ, সানফ্লাওয়ার লাইফ, সান লাইফ, গোল্ডেন লাইফ এবং ফারইস্ট ইসলামী লাইফসহ একাধিক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে গ্রাহকের শতকোটি টাকা আত্মসাৎ বা অবৈধ ব্যয়ের অভিযোগ রয়েছে। এর ফলে গ্রাহকদের প্রাপ্য অর্থ ফেরত পাওয়া অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
এই পরিস্থিতির প্রভাব পড়েছে ব্যবসায়িক কার্যক্রমে। বীমা প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা কমে যাওয়ায় মানুষ নতুন পলিসি নিতে আগ্রহ হারাচ্ছেন। এর ফলে ২০২৪ সালে জীবন বীমা খাতে প্রিমিয়াম আয় কমেছে প্রায় ৭ কোটি টাকা, গ্রাহকসংখ্যা কমেছে ১০ লাখেরও বেশি। গত ১৪ বছরে প্রায় ২৬ লাখ গ্রাহক মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই পলিসি বাতিল করেছেন।
এই পরিস্থিতিতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএ -এর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। যদিও পদ্মা ইসলামী লাইফকে ২১১ কোটি টাকার দাবিনামা পরিশোধ না করায় কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে, সামগ্রিকভাবে খাত নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগ সীমিত। সূত্র অনুযায়ী, দেশের অর্ধেকের বেশি বীমা প্রতিষ্ঠান ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে, যার মধ্যে অন্তত ৩২টি উচ্চ ঝুঁকিতে।
বিনিয়োগে দুর্বলতা ও আর্থিক শৃঙ্খলার অভাবে অনেক প্রতিষ্ঠান এখন দাবি পরিশোধের সক্ষমতা হারিয়েছে। ফলে বীমা খাত এখন অনিশ্চয়তার প্রতীকে পরিণত হয়েছে। এই সংকট কাটিয়ে উঠতে নতুন আইন, ট্রাস্টি বোর্ড গঠন ও তদারকি জোরদারের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তবে বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে। সব মিলিয়ে বীমা খাত এখন গভীর আস্থার সংকটে রয়েছে, যা পুরো অর্থনীতির ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
বাংলাদেশের বীমা খাত এখন আস্থাহীনতা ও অনিয়মের এক গভীর সংকটে। শতকোটি টাকার আত্মসাৎ ও দুর্নীতির অভিযোগ খাতটিকে অকার্যকর অবস্থার দিকে ঠেলে দিয়েছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থার দুর্বলতার কারণে দুর্নীতি ও আর্থিক বিশৃঙ্খলা বেড়েছে। অন্তত ছয়টি বীমা কোম্পানি প্রায় ৩ হাজার ৭৩৬ কোটি টাকা আত্মসাৎ বা অপচয়ের সঙ্গে জড়িত। একই সময়ে ১৩ লাখেরও বেশি গ্রাহকের প্রায় ৪ হাজার ৪১৪ কোটি টাকার দাবি এবং প্রায় ১০ লাখ পলিসিহোল্ডারের সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকার দাবি বছরের পর বছর আটকে আছে।
সাধারণ বীমা করপোরেশনে ২৬ কোটি ১৫ লাখ টাকার আত্মসাতের ঘটনায় সংঘবদ্ধ চক্রের সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি নন-লাইফ খাতে ডামি এজেন্ট ব্যবহার করে অর্থ সরানোর অভিযোগও উঠেছে। ২৯টি জীবন বীমা প্রতিষ্ঠান তারল্য সংকটে রয়েছে এবং অনেক প্রতিষ্ঠান দাবি পরিশোধে অক্ষম। ২০২৪ সালে লাইফ ফান্ডে জমা হয়েছে মাত্র ৪১৫ কোটি টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় অর্ধেকেরও কম। বীমা খাতের জিডিপি অবদান মাত্র ০.৪ শতাংশের কিছু বেশি।
২০২৩ থেকে ২০২৪ সালে গ্রাহক কমেছে ১০ লাখেরও বেশি এবং পলিসি সংখ্যা ৭৮ লাখ থেকে নেমে এসেছে প্রায় ৭০ লাখে। ৪৬টি নন-লাইফ কোম্পানি প্রায় ৩ হাজার ১৫০ কোটি টাকার দাবি আটকে রেখেছে। ২০০৯–২০১৫ সময়ে ১৭টি কোম্পানি প্রায় ১ হাজার ৯৭৮ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় করেছে। পরবর্তীতে অঙ্গীকার ও সংস্কার উদ্যোগ নেওয়া হলেও কার্যকর ফল আসেনি। সর্বশেষ ২০২৫ সালে ২০টি কোম্পানি ১৩২ কোটি ৫৪ লাখ টাকা অতিরিক্ত ব্যয় করেছে, যার মধ্যে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ, শান্তা লাইফ, প্রোগ্রেসিভ লাইফসহ অনেক প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
আইন অনুযায়ী এই ব্যয়ের ৯০ শতাংশ পলিসিহোল্ডারদের প্রাপ্য। ফলে ক্ষতির শিকার হচ্ছেন সাধারণ গ্রাহকরা। ব্যবস্থাপনা দুর্বলতা, অদক্ষতা ও উচ্চ কমিশন কাঠামোকে এর জন্য দায়ী করা হচ্ছে। সব মিলিয়ে বীমা খাত এখন গভীর কাঠামোগত ও নৈতিক সংকটে রয়েছে।
খাতজুড়ে অনিয়ম, দাবি পরিশোধে স্থবিরতা এবং আত্মসাতের অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও কার্যকর ব্যবস্থা সীমিত। অনেক ক্ষেত্রে নামমাত্র জরিমানা ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়। কিছু নন-লাইফ কোম্পানির বিরুদ্ধে তদন্ত চললেও তা প্রাথমিক পর্যায়ে সীমিত। অটোমেশন প্রকল্পে প্রায় ৮০০ কোটি টাকা অপব্যয়ের অভিযোগও উঠেছে, যা ডিজিটাল উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত করেছে। মাঠ পর্যায়ে অনেক কোম্পানি নির্দেশনা মানছে না বলে অভিযোগ রয়েছে, এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বিষয়টি চিঠি ও বৈঠকে সীমাবদ্ধ থাকছে।
আইডিআরএ নতুন আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে, যেখানে দেউলিয়া কোম্পানির সম্পদ বিক্রি করে গ্রাহকের টাকা ফেরত দেওয়ার সুযোগ রাখা হবে। কিছু প্রতিষ্ঠানের নতুন পলিসি বিক্রিও বন্ধ করা হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, আত্মসাৎকৃত অর্থ উদ্ধার ও দাবি নিষ্পত্তিতে কঠোর পদক্ষেপ ছাড়া আস্থা ফেরানো সম্ভব নয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আইডিআরএ-কে প্রভাবমুক্ত ও কঠোর ভূমিকা নিতে হবে। দাবি নিষ্পত্তি দ্রুত নিশ্চিত করা, আর্থিক অনিয়মে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। কোম্পানিগুলোর সুশাসন, দক্ষ ব্যবস্থাপনা, CFO নিয়োগ এবং নিয়মিত স্বাধীন অডিট বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন। পাশাপাশি পুরো প্রক্রিয়া ডিজিটাল করলে স্বচ্ছতা বাড়বে। দুর্বল কোম্পানিগুলো পুনর্গঠন বা একীভূত করা হলে স্থিতিশীলতা ফিরতে পারে। গ্রাহকের অর্থ ফেরতের নিশ্চয়তা ছাড়া আস্থা পুনরুদ্ধার সম্ভব নয়। ২০২৫–২০২৬ সালে নতুন আইন ও অর্ডিন্যান্সের মাধ্যমে মালিকানা পরিবর্তন, একীভূতকরণ এবং ব্যক্তিগত সম্পদ বিক্রির মাধ্যমে অর্থ আদায়ের পরিকল্পনাও চলছে।
শতকোটি টাকার আত্মসাৎ, অনিয়ম ও দীর্ঘদিনের দাবি অনিষ্পত্তির কারণে বাংলাদেশের বীমা খাত গভীর আস্থাহীনতায় পড়েছে। এই সংকট থেকে উত্তরণে নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএ- কে আরও কঠোর, স্বচ্ছ ও কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে। অন্যথায়, এই খাতে আস্থা পুনরুদ্ধার কঠিন হয়ে পড়বে।

