বাংলাদেশে বীমা খাতের যাত্রা শুরু হয় ১৯৭৩ সালে সাধারণ বীমা করপোরেশন ও জীবন বীমা করপোরেশন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পার হলেও প্রত্যাশিত বিস্তার ঘটেনি এই খাতে। বর্তমানে ১৭ কোটির বেশি মানুষের দেশে বীমার আওতায় রয়েছে প্রায় দুই কোটি মানুষ। অথচ দেশে কার্যক্রম চালাচ্ছে ৮২টি বীমা প্রতিষ্ঠান।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সীমিত বিস্তারের অন্যতম প্রধান কারণ হলো গ্রাহকদের আস্থার সংকট। আর সেই সংকটের বড় উৎস বীমা দাবি নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা। প্রয়োজনের সময় দাবি আদায়ে ভোগান্তি ও বিলম্বের কারণে সাধারণ মানুষ বীমা খাতের প্রতি আগ্রহ হারাচ্ছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি প্রতিবেদন ২০২৫ অনুযায়ী, বীমা দাবি নিষ্পত্তির হার ধারাবাহিকভাবে কমছে। ২০২৩ সালে সাধারণ বীমা খাতে দাবি নিষ্পত্তির হার ছিল ৪১ দশমিক ৩৫ শতাংশ। ২০২৫ সালের শেষে তা কমে দাঁড়িয়েছে ২৮ দশমিক ৫১ শতাংশে। একই সময়ে জীবন বীমা খাতে দাবি নিষ্পত্তির হার ৭২ দশমিক ৪৩ শতাংশ থেকে নেমে এসেছে ৬৬ দশমিক ৫৪ শতাংশে। গত বছরের শেষে পুরো বীমা খাতে অনিষ্পন্ন দাবির পরিমাণ প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। এ পরিস্থিতি যে খাতটির প্রতি জনআস্থা আরও দুর্বল করেছে, তা সহজেই অনুমেয়।
মূলত বীমা এমন একটি আর্থিক ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে মানুষ ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা মোকাবিলার প্রস্তুতি নেয়। নির্দিষ্ট সময় ধরে প্রিমিয়াম জমা দিয়ে কেউ ভবিষ্যৎ সঞ্চয়ের নিশ্চয়তা খোঁজেন, আবার কেউ দুর্ঘটনা, মৃত্যু বা সম্পদের ক্ষতির মতো ঝুঁকির বিরুদ্ধে সুরক্ষা নিশ্চিত করতে চান। কিন্তু সংকটের মুহূর্তে যদি বীমা প্রতিষ্ঠানই প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী অর্থ পরিশোধে দেরি করে বা গ্রাহককে হয়রানির মুখে ফেলে, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই মানুষের আস্থা নষ্ট হয়। ফলে বীমার মৌলিক উদ্দেশ্যই প্রশ্নের মুখে পড়ে।
এদিকে বীমা সম্পর্কে সমাজে এখনো নানা ধরনের ভুল ধারণা রয়েছে। সচেতনতার ঘাটতিও কম নয়। কিন্তু যারা ইতোমধ্যে বীমার আওতায় এসেছেন, তারাও যখন দাবি আদায়ে সমস্যার মুখোমুখি হন, তখন নেতিবাচক ধারণা আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। এতে নতুন গ্রাহক আকৃষ্ট হওয়ার পথও সংকুচিত হয়।
বীমা কোম্পানিগুলোর দাবি, অনেক সময় প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ, জরিপকারীর প্রতিবেদন পাওয়া কিংবা পুনঃবীমা দাবির অর্থ ফেরত পেতে বিলম্ব হওয়ার কারণে দাবি নিষ্পত্তি পিছিয়ে যায়। বিশেষ করে সাধারণ বীমার ক্ষেত্রে অগ্নিকাণ্ড, সামুদ্রিক দুর্ঘটনা বা শিল্পকারখানার ঝুঁকি সংক্রান্ত দাবিতে বিস্তারিত যাচাই-বাছাই প্রয়োজন হয়। তবে এই ব্যাখ্যা দিয়ে পুরো সমস্যাকে ব্যাখ্যা করা যায় না। কারণ জীবন বীমা খাতে তুলনামূলক কম জটিলতা থাকা সত্ত্বেও সেখানেও দাবি নিষ্পত্তির হার কমছে।
পর্যবেক্ষকদের মতে, সমস্যার গভীরে রয়েছে সুশাসনের ঘাটতি, দুর্বল আর্থিক ব্যবস্থাপনা এবং অপর্যাপ্ত তদারকি। অনেক প্রতিষ্ঠান সংগৃহীত প্রিমিয়াম নিরাপদ ও কার্যকরভাবে বিনিয়োগ করতে পারেনি। কোথাও তহবিল ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা রয়েছে, আবার কোথাও অনিয়ম ও অপব্যবহারের অভিযোগও উঠেছে। এর পাশাপাশি সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকটি সংকটাপন্ন ব্যাংকে বীমা কোম্পানিগুলোর বিপুল পরিমাণ আমানত আটকে যাওয়ায় তারল্য সংকট বেড়েছে। ফলে গ্রাহকদের দাবি পরিশোধে অনেক প্রতিষ্ঠান চাপে পড়েছে।
এ অবস্থায় নিয়ন্ত্রক সংস্থা বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের দায়িত্বও সামনে চলে আসে। শুধু নীতিমালা প্রণয়ন করাই যথেষ্ট নয়, সেগুলোর কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাও জরুরি। কোনো প্রতিষ্ঠান দীর্ঘ সময় ধরে দাবি পরিশোধে ব্যর্থ হলে দ্রুত ও দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে আর্থিকভাবে দুর্বল কোম্পানিগুলোর পুনর্গঠন, পরিচালনায় জবাবদিহি এবং গ্রাহকের স্বার্থ সুরক্ষায় কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশে বীমা খাতের বিস্তার এখনো খুবই সীমিত। জনসংখ্যার তুলনায় বীমা গ্রহণকারীর সংখ্যা কম, আর জনপ্রতি প্রিমিয়ামের পরিমাণও আন্তর্জাতিক মানের তুলনায় অনেক নিচে। এর পেছনে মানুষের নেতিবাচক অভিজ্ঞতা বড় ভূমিকা রাখছে। যখন গ্রাহকরা দেখেন দাবি পাওয়ার জন্য বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হয়, তখন নতুন করে বীমা গ্রহণের আগ্রহ কমে যায়। এর প্রভাব পড়ে পুরো শিল্পের প্রবৃদ্ধির ওপর। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয় ও বিনিয়োগের গুরুত্বপূর্ণ একটি উৎসও দুর্বল হয়ে পড়ে।
অর্থনীতির জন্য একটি শক্তিশালী বীমা শিল্প অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই খাত দীর্ঘমেয়াদি মূলধন গঠন, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং বিনিয়োগে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম। তবে সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে প্রথমেই ফিরিয়ে আনতে হবে গ্রাহকের আস্থা। আর সেই আস্থা পুনর্গঠনের একমাত্র পথ হলো দ্রুত, স্বচ্ছ ও ন্যায্যভাবে বীমা দাবি নিষ্পত্তি নিশ্চিত করা।
সেজন্য কয়েকটি পদক্ষেপ জরুরি। প্রথমত, সমস্যাগ্রস্ত বীমা কোম্পানিগুলোকে চিহ্নিত করে পুনর্গঠনের উদ্যোগ নিতে হবে। দ্বিতীয়ত, দাবি নিষ্পত্তির জন্য নির্ধারিত সময়সীমা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন এবং তার অগ্রগতি প্রকাশ করতে হবে। তৃতীয়ত, বিনিয়োগ ও তারল্য ব্যবস্থাপনায় আরও শক্তিশালী নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। চতুর্থত, পুনঃবীমা ও দাবি যাচাই প্রক্রিয়াকে প্রযুক্তিনির্ভর ও দ্রুততর করতে হবে। সবশেষে মনে রাখতে হবে, বীমা শিল্পের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার মূলধন নয়, বরং মানুষের বিশ্বাস। সেই বিশ্বাস পুনরুদ্ধার করতে না পারলে খাতটির সম্ভাবনা অপূর্ণই থেকে যাবে।

