আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মধ্যে দীর্ঘদিনের উত্তেজনা আবারও নতুন করে সামনে এসেছে। পূর্বাঞ্চলীয় কুনার প্রদেশে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলার ঘটনায় অন্তত ৭ জন নিহত এবং প্রায় ৭৫ জন আহত হওয়ার খবর পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এই ঘটনার জন্য সরাসরি পাকিস্তানকে দায়ী করেছে আফগানিস্তানের তালেবান প্রশাসন, যদিও ইসলামাবাদ তা পুরোপুরি অস্বীকার করেছে।
বিবিসির তথ্য অনুযায়ী, কুনার বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় এই হামলার ঘটনা ঘটে। বিস্ফোরণে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবনসহ আশপাশের এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। আহতদের মধ্যে শিক্ষক ও শিক্ষার্থী—দুই পক্ষই রয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ৩০ জন শিক্ষার্থী বলে জানিয়েছে আফগান কর্তৃপক্ষ।
ঘটনার সময়ের বর্ণনা দিতে গিয়ে স্থানীয় এক সাংবাদিক জানান, দুপুরের দিকে হঠাৎ একের পর এক বিকট শব্দ শোনা যায়। আতঙ্কিত মানুষজন শহরের কেন্দ্র থেকে দৌড়ে পালাতে শুরু করে। পুরো এলাকা মুহূর্তেই বিশৃঙ্খল হয়ে পড়ে।
আফগানিস্তানের উচ্চশিক্ষা মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানায়, হামলায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে। তালেবান প্রশাসনের দাবি, এই আক্রমণে মর্টার ও রকেট ব্যবহার করা হয়েছে। তবে প্রত্যক্ষদর্শীদের কেউ কেউ বলেছেন, এতে যুদ্ধবিমান ও ড্রোন ব্যবহারের সম্ভাবনাও রয়েছে।
অন্যদিকে পাকিস্তানের তথ্য মন্ত্রণালয় এই অভিযোগ সরাসরি নাকচ করে দিয়েছে। তাদের বক্তব্য, কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা আবাসিক এলাকায় তারা হামলা চালায়নি, এবং পুরো ঘটনাটি ‘ভিত্তিহীন’ বলে দাবি করেছে ইসলামাবাদ।
এই হামলার সময়টিও বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, গত কয়েক সপ্তাহ ধরেই চীনের মধ্যস্থতায় দুই দেশের মধ্যে একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি চলছিল। আলোচনার মাধ্যমে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলছিল, এবং উভয় পক্ষই প্রকাশ্যে উত্তেজনামূলক বক্তব্য দেওয়া থেকে বিরত ছিল। কিন্তু এই হামলার পর সেই নীরবতা ভেঙে যায়।
তালেবান প্রশাসনের মুখপাত্র ঘটনাটিকে ‘অমার্জনীয় যুদ্ধাপরাধ’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। তার বক্তব্য, এটি শুধু একটি সামরিক হামলা নয়, বরং ইচ্ছাকৃতভাবে সাধারণ মানুষের ওপর আঘাত হানা হয়েছে—যা পরিস্থিতিকে আরও উসকে দিতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনার মাধ্যমে স্পষ্ট হয়ে উঠছে যে, দুই দেশের মধ্যে আস্থার সংকট এখনো গভীর। পাকিস্তান যেখানে দাবি করছে তারা কেবল বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে অভিযান চালায়, সেখানে আফগানিস্তান অভিযোগ করছে সাধারণ নাগরিকদের লক্ষ্যবস্তু বানানো হচ্ছে।
একসময় তালেবানের অন্যতম সমর্থক হিসেবে পরিচিত পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক এখন অনেকটাই তিক্ত। মূল বিরোধের কেন্দ্রে রয়েছে সীমান্তবর্তী এলাকায় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর উপস্থিতি ও তাদের আশ্রয়ের অভিযোগ। এই দ্বন্দ্বই এখন ধীরে ধীরে সীমান্তজুড়ে ছোট পরিসরের সংঘাতে রূপ নিচ্ছে।
সব মিলিয়ে, কুনারের এই ঘটনা কেবল একটি বিচ্ছিন্ন হামলা নয়—বরং এটি দুই দেশের সম্পর্কের গভীর সংকটের প্রতিফলন। এখন প্রশ্ন হলো, এই উত্তেজনা কি আবার বড় সংঘর্ষে রূপ নেবে, নাকি কূটনৈতিক পথে ফিরে গিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব হবে।
সিভিডেস্ক/এইচএম

