ইউরোপের নিরাপত্তা ভাবনায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসছে। বহু দশক ধরে ইউরোপের বেশির ভাগ দেশ যুদ্ধ, প্রতিরক্ষা ও কৌশলগত নিরাপত্তাকে মূলত দুটি কাঠামোর ভেতর দিয়ে দেখেছে—একদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, অন্যদিকে উত্তর আটলান্টিক সামরিক জোট। এই দুই কাঠামোই ছিল ইউরোপের নিরাপত্তা ধারণার কেন্দ্র। কিন্তু ইউক্রেন যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা সেই পুরোনো ধারণাকে কঠিন প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়েছে।
এখন স্পষ্ট হচ্ছে, শুধু প্রতিষ্ঠিত জোটের ওপর নির্ভর করে ইউরোপ তার স্বার্থ রক্ষা করতে পারবে না। বিশ্বের শক্তির ভারসাম্য বদলাচ্ছে, পুরোনো মিত্রতার ভেতরেও ফাটল দেখা দিচ্ছে, আর যুদ্ধের প্রভাব সীমান্তের ভেতরে আটকে থাকছে না। ফলে ইউরোপকে এমন এক নিরাপত্তা কৌশলের দিকে এগোতে হচ্ছে, যেখানে বড় সামরিক জোটের পাশাপাশি ছোট, নমনীয় এবং পরিস্থিতিভিত্তিক অংশীদারিত্বও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
২৮ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে প্রকাশিত নিকু পোপেস্কু ও ফ্রেডরিক ভেসলাউয়ের বিশ্লেষণে এই পরিবর্তনের কথাই উঠে এসেছে। তাদের মতে, ইউরোপের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নতুন করে সাজানো প্রয়োজন, কারণ ভেঙে পড়া মিত্রতা ও অনিশ্চিত বিশ্বব্যবস্থার যুগে বিস্তৃত নিরাপত্তা অংশীদারিত্বই ইউরোপের শক্তির নতুন উৎস হতে পারে।
ইউক্রেন এই পরিবর্তনের সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ। ইউক্রেন এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক সামরিক জোটের সদস্য নয়। কিন্তু যুদ্ধের বাস্তবতা ইউরোপকে এমন এক অবস্থানে নিয়ে এসেছে, যেখানে ইউক্রেনের নিরাপত্তা আর শুধু ইউক্রেনের বিষয় নয়। ইউরোপীয় দেশগুলো ইউক্রেনের সঙ্গে নানা ধরনের নিরাপত্তা চুক্তি করেছে। সংখ্যাটি ২০টির বেশি। এসব চুক্তির মাধ্যমে সামরিক সহায়তা, অর্থায়ন এবং যুদ্ধবিরতির পর ইউক্রেনের নিরাপত্তা রক্ষায় সহযোগিতার কাঠামো তৈরি করা হচ্ছে।
এই প্রক্রিয়ায় “ইচ্ছুক দেশগুলোর জোট” ধারণাটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অর্থাৎ সব দেশ একসঙ্গে একই কাঠামোর অধীনে না এলেও, যারা প্রস্তুত তারা নির্দিষ্ট সংকটে একসঙ্গে কাজ করছে। এটি ইউরোপের জন্য নতুন নয়, তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে এর গুরুত্ব অনেক বেড়ে গেছে। কারণ যুদ্ধ এখন এমন জায়গায় পৌঁছেছে, যেখানে দ্রুত সিদ্ধান্ত, সরাসরি সহায়তা এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা—সবকিছু একসঙ্গে প্রয়োজন।
মধ্যপ্রাচ্যেও ইউরোপ একই ধরনের বাস্তবতার মুখোমুখি। উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা ইউরোপের জ্বালানি, অর্থনীতি ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। তাই ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য ও নেদারল্যান্ডসসহ কয়েকটি দেশ কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবের নিরাপত্তায় সহায়তা দিতে জাহাজ, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, যুদ্ধবিমানসহ নানা সক্ষমতা পাঠিয়েছে। আরও বিস্তৃতভাবে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, নেদারল্যান্ডস, ডেনমার্ক, লাটভিয়া, স্লোভেনিয়া, এস্তোনিয়া, নরওয়ে, সুইডেন, ফিনল্যান্ড, চেক প্রজাতন্ত্র, রোমানিয়া, লিথুয়ানিয়াসহ ইউরোপের ভেতর ও বাইরের কয়েকটি অংশীদার দেশ নৌ চলাচলের স্বাধীনতা ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা রক্ষায় ভূমিকা রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
এই ঘটনাগুলো দেখাচ্ছে, ইউরোপের নিরাপত্তা নীতি আর শুধু নিজের ভৌগোলিক সীমানায় সীমাবদ্ধ নেই। ইউরোপ এখন বুঝতে পারছে, তার স্বার্থ যেখানে ঝুঁকিতে পড়বে, সেখানেই তাকে কোনো না কোনোভাবে উপস্থিত থাকতে হবে। সেটা ইউক্রেন হোক, উপসাগরীয় অঞ্চল হোক, কিংবা ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগ দিতে আগ্রহী কোনো ছোট রাষ্ট্র হোক।
ইউক্রেনের ক্ষেত্রে এই যুক্তি সবচেয়ে শক্তিশালী। যদি রাশিয়া ইউক্রেনে প্রভাব প্রতিষ্ঠা করতে পারে, যুদ্ধবিরতির পর আবার আক্রমণ শুরু করে, অথবা অন্য কোনো আঞ্চলিক লক্ষ্য নির্ধারণ করে, তাহলে তার প্রভাব সরাসরি ইউরোপের ওপর পড়বে। রুশ নিয়ন্ত্রণাধীন ইউক্রেন শুধু একটি ভূখণ্ডগত পরিবর্তন হবে না; তা হবে প্রাকৃতিক সম্পদ, মানবসম্পদ, শিল্পক্ষমতা এবং নতুন প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিসমৃদ্ধ এক বিশাল কৌশলগত শক্তির পুনর্বিন্যাস। এমন পরিস্থিতি শুধু পোল্যান্ড বা জার্মানির জন্য নয়, ফ্রান্স, নরওয়ে, স্পেনসহ পুরো ইউরোপের জন্য দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা সংকট তৈরি করতে পারে।
এ কারণেই ইউরোপের নীতিনির্ধারকদের কাছে ইউক্রেনের নিরাপত্তা এখন নিজের নিরাপত্তার অংশ হয়ে উঠেছে। ইউক্রেন দুর্বল হলে ইউরোপের পূর্ব সীমানা দুর্বল হবে। আর ইউক্রেন টিকে থাকলে ইউরোপের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও তুলনামূলকভাবে শক্ত অবস্থানে থাকবে। এই বাস্তবতা ইউরোপকে আনুষ্ঠানিক সদস্যপদের বাইরেও নিরাপত্তা নিশ্চয়তার নতুন পথ খুঁজতে বাধ্য করছে।
একইভাবে উপসাগরীয় রাজতন্ত্রগুলোর স্থিতিশীলতাও ইউরোপের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। জ্বালানির বাজার, বাণিজ্যিক পথ, বিনিয়োগ, খাদ্যপণ্য পরিবহন এবং রাজনৈতিক চাপ—সবকিছুই ওই অঞ্চলের নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত। তাই মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা ইউরোপের ঘরে আগুন না লাগালেও তার ধোঁয়া ইউরোপের অর্থনীতি ও রাজনীতিকে ঘিরে ধরে। এই কারণেই ইউরোপ এখন ঐতিহ্যগত সামরিক জোটের বাইরে গিয়ে নতুন অংশীদার খুঁজছে।
তবে এই নতুন নিরাপত্তা বাস্তবতায় সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে আছে ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগ দিতে আগ্রহী রাষ্ট্রগুলো। তারা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু যথেষ্ট সুরক্ষিত নয়। এদের অনেকেই এমন অঞ্চলে অবস্থিত, যেখানে রাশিয়ার প্রভাব, আঞ্চলিক উত্তেজনা, সীমান্তবিরোধ এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা একসঙ্গে কাজ করছে। ফলে তারা ইউরোপের নিরাপত্তা মানচিত্রে ধূসর অঞ্চলে পরিণত হয়েছে—না পুরোপুরি ভেতরে, না পুরোপুরি বাইরে।
এই জায়গায় মলদোভা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দেশটি সাংবিধানিকভাবে নিরপেক্ষ হলেও বাস্তবতা তাকে নতুন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করছে। মার্চ মাসে মলদোভা আনুষ্ঠানিকভাবে ইউক্রেনকে সমর্থনকারী ইচ্ছুক দেশগুলোর জোটে যোগ দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করে। একটি নিরপেক্ষ দেশের জন্য এটি বড় পদক্ষেপ। এর অর্থ হলো, মলদোভা বুঝতে পারছে—শুধু নিরপেক্ষতা নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিতে পারে না; অনেক সময় টিকে থাকতে হলে পারস্পরিক সহায়তা ও সংহতির ওপর নির্ভর করতেই হয়।
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো মলদোভার ঝুঁকি আরও স্পষ্ট করেছে। মার্চ মাসে ইউক্রেনের একটি জলবিদ্যুৎ বাঁধে রুশ হামলার ফলে নিস্ত্রু নদীতে বড় ধরনের তেল ছড়িয়ে পড়ে। এই নদী মলদোভার প্রধান পানির উৎস। এর ফলে মলদোভার দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর এবং কয়েকটি জেলায় কয়েক সপ্তাহ পরিষ্কার পানির সংকট দেখা দেয়। রোমানিয়া ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্য সদস্যরা সহায়তায় এগিয়ে না এলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারত।
এরপর ইউক্রেনীয় ভূখণ্ডে আরেকটি রুশ ড্রোন হামলায় মলদোভার সঙ্গে রোমানিয়ার বিদ্যুৎ সংযোগের একটি অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই ঘটনা দেখিয়ে দেয়, যুদ্ধের সরাসরি লক্ষ্য না হয়েও মলদোভা যুদ্ধের প্রভাব থেকে নিরাপদ নয়। রাশিয়া হয়তো ধরে নিয়েছে, এমন আচরণের জন্য তাকে বড় মূল্য দিতে হবে না। এই ধারণা যদি অটুট থাকে, তবে মলদোভার মতো ছোট রাষ্ট্রগুলোর নিরাপত্তা আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠবে।
মলদোভার ক্ষেত্রে ইউরোপের সামনে তাই একটি স্পষ্ট প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে: ইউক্রেন ও উপসাগরীয় অঞ্চলে যদি নিরাপত্তা সহায়তার কাঠামো গড়ে তোলা যায়, তাহলে মলদোভার জন্য কেন একই ধরনের ব্যবস্থা তৈরি করা যাবে না? মলদোভা শুধু একটি ছোট দেশ নয়; এটি ইউরোপের পূর্ব নিরাপত্তা বলয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সেখানে অস্থিরতা তৈরি হলে তার চাপ রোমানিয়া হয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ভেতরেই এসে পড়বে।
পশ্চিম বলকান অঞ্চলও একইভাবে গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ছে, ভূরাজনৈতিক বিভাজন গভীর হচ্ছে, আর পুরোনো জাতিগত ও সীমান্তসংক্রান্ত উত্তেজনা পুরোপুরি মিলিয়ে যায়নি। এই অঞ্চলে অস্থিরতা তৈরি হলে ইউরোপের দক্ষিণ-পূর্ব অংশ আবারও সংকটে পড়তে পারে। তাই ইউরোপের উচিত শুধু প্রতিক্রিয়া দেখানো নয়, আগে থেকেই নিশ্চয়তা ও স্থিতিশীলতার ব্যবস্থা করা।
পশ্চিম বলকানে ইউরোপ যদি বিদ্যমান সীমান্তের নিরাপত্তা আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করে, তাহলে তা ওই অঞ্চলে উদ্বেগ কমাতে পারে। একই সঙ্গে ইউরোপের শান্তিরক্ষক হিসেবে বিশ্বাসযোগ্যতাও বাড়বে। কারণ শুধু নিজের ভেতরে শান্তি বজায় রাখলেই চলবে না; সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলোতেও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় সংকট একসময় ভেতরের নিরাপত্তাকেও দুর্বল করবে।
সব মিলিয়ে ইউরোপ এখন এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছে, যখন পুরোনো নিরাপত্তা চিন্তা যথেষ্ট নয়। বড় জোট থাকবে, কিন্তু শুধু বড় জোটের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। ছোট রাষ্ট্র, সম্ভাব্য সদস্য দেশ, আঞ্চলিক অংশীদার—সবাইকে নিয়ে এক নতুন নিরাপত্তা জাল তৈরি করতে হবে। এই জাল যত ঘন হবে, ইউরোপের প্রতিরক্ষা অবস্থান তত শক্ত হবে।
বিশ্বব্যবস্থা এখন আগের চেয়ে বেশি ভাঙাচোরা। মিত্রতা বদলাচ্ছে, শক্তির কেন্দ্র সরে যাচ্ছে, আর যুদ্ধের প্রভাব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। এই বাস্তবতায় নিরাপত্তা আর কেবল সামরিক শক্তির প্রশ্ন নয়; এটি রাজনৈতিক বিশ্বাস, অর্থনৈতিক স্থিতি, জ্বালানি সরবরাহ, সীমান্ত সুরক্ষা এবং কৌশলগত দূরদর্শিতার সমন্বিত বিষয়।
ইউরোপের সামনে তাই সিদ্ধান্ত স্পষ্ট। যারা ইউরোপের নিরাপত্তা বলয়ের অংশ হতে চায়, তাদের শুধু অপেক্ষার ঘরে রেখে দিলে চলবে না। তাদের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা গভীর করতে হবে, নিরাপত্তা নিশ্চয়তা দিতে হবে এবং সংকটের আগেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। ইউক্রেন, মলদোভা ও পশ্চিম বলকানের অভিজ্ঞতা দেখাচ্ছে—ছোট রাষ্ট্রকে অবহেলা করলে বড় সংকট তৈরি হতে সময় লাগে না।
নতুন যুগে ইউরোপের শক্তি শুধু বড় দেশের সামরিক সক্ষমতায় নয়, বরং কত দূর পর্যন্ত সে বিশ্বাসযোগ্য নিরাপত্তা অংশীদার হতে পারে—সেখানেই নির্ধারিত হবে। পুরোনো জোটের পাশাপাশি নতুন অংশীদারিত্বই হতে পারে ইউরোপের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার মূল ভিত্তি।
সিভি/এইচএম

