দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা পরিবেশে সমুদ্র এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একসময় ভারত-পাকিস্তান সামরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা বলতে স্থলসীমান্ত, আকাশপথ কিংবা পারমাণবিক ভারসাম্যের কথাই বেশি আলোচনায় আসত। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে আরব সাগর, ভারত মহাসাগর এবং নৌবাহিনীর সক্ষমতা—এই বিষয়গুলোও কৌশলগত হিসাবের কেন্দ্রে চলে এসেছে। বিশেষ করে পাকিস্তান নৌবাহিনীর সাম্প্রতিক একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা ইঙ্গিত দিচ্ছে, দেশটি সমুদ্রক্ষেত্রে এমন এক প্রতিরক্ষা কৌশলের দিকে এগোচ্ছে, যার লক্ষ্য সরাসরি সমুদ্র নিয়ন্ত্রণ নয়; বরং প্রতিপক্ষকে নির্দিষ্ট এলাকায় স্বাধীনভাবে চলাচল করতে না দেওয়া।
এই কৌশলকে সহজ ভাষায় বলা যায়—প্রতিপক্ষের নৌবহরকে দূরে রাখা। পাকিস্তানের হিসাব হলো, বড় নৌবহরের সঙ্গে বড় নৌবহর দিয়ে প্রতিযোগিতা করা ব্যয়বহুল এবং দীর্ঘমেয়াদে কঠিন। তাই জাহাজের সংখ্যা বাড়ানোর দৌড়ে না গিয়ে দেশটি এমন অস্ত্রব্যবস্থা তৈরি ও সংযোজন করছে, যা দূর থেকে প্রতিপক্ষের গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধজাহাজ, বিমানবাহী রণতরি কিংবা স্থল-লক্ষ্যে আঘাত হানতে পারে। এর মাধ্যমে পাকিস্তান নৌবাহিনী নিজের উপকূলের কাছে প্রতিরোধ বলয় গড়ে তুলতে চাইছে।
সাম্প্রতিক পরীক্ষাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত হলো আকাশ থেকে নিক্ষেপযোগ্য তাইমুর এএলসিএম। ২১ এপ্রিল পাকিস্তান নৌবাহিনী এই ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালায়। এর পাল্লা ৬০০ কিলোমিটার বলে জানানো হয়েছে। এটি স্থল ও সমুদ্র—দুই ধরনের লক্ষ্যবস্তুতেই আঘাত করতে সক্ষম বলে বর্ণনা করা হয়েছে। এর তাৎপর্য হলো, পাকিস্তান এখন শুধু জাহাজ বা সাবমেরিন থেকে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্রের ওপর নির্ভর করছে না; আকাশ থেকেও দূরপাল্লার জাহাজবিধ্বংসী আঘাতের সক্ষমতা বাড়াচ্ছে।
এর আগে ১৫ এপ্রিল পরীক্ষা করা হয় পি২৮২ স্ম্যাশ নামে পরিচিত জাহাজ থেকে নিক্ষেপযোগ্য জাহাজবিধ্বংসী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র। এটি বাবর শ্রেণির করভেট থেকে ছোড়া হয় এবং এর পাল্লা ৪৫০ কিলোমিটার বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এর আগে একই ধরনের একটি ক্ষেপণাস্ত্র জুলফিকার শ্রেণির ফ্রিগেট থেকে পরীক্ষা করা হয়েছিল, যার পাল্লা ছিল ৩৫০ কিলোমিটার। অর্থাৎ, পাকিস্তান ধাপে ধাপে তার নৌবাহিনীর আঘাতের পরিসর বাড়াচ্ছে।
পি২৮২ স্ম্যাশ ক্ষেপণাস্ত্রের গুরুত্ব শুধু পাল্লার কারণে নয়। এর নির্দেশনা ব্যবস্থায় এমন প্রযুক্তির কথা বলা হয়েছে, যা চলমান সমুদ্র-লক্ষ্য এবং স্থির স্থল-লক্ষ্য—দুই ক্ষেত্রেই নির্ভুল আঘাতে সহায়তা করতে পারে। ক্ষেপণাস্ত্রটির শেষ ধাপের আক্রমণপথ প্রায় খাড়া হওয়ায় আধুনিক নৌ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য সেটি মোকাবিলা করা কঠিন হতে পারে। ফলে বিমানবাহী রণতরি, বড় যুদ্ধজাহাজ বা উচ্চমূল্যের নৌসম্পদের বিরুদ্ধে এ ধরনের অস্ত্র কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
এখানে পাকিস্তানের মূল লক্ষ্য পরিষ্কার—ভারতের সঙ্গে জাহাজের সংখ্যায় সমতা নয়, বরং গুণগত প্রতিরোধ। ভারতীয় নৌবাহিনী দ্রুত আধুনিক হচ্ছে। নতুন গাইডেড মিসাইল ফ্রিগেট, করভেট, বিমানবাহী রণতরি, ব্রাহ্মোস ধরনের দূরপাল্লার জাহাজবিধ্বংসী অস্ত্র, বহুস্তরীয় ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা এবং দীর্ঘপাল্লার আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভারতীয় নৌশক্তিকে আরও বিস্তৃত করছে। এর ফলে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ভারতের ক্ষমতা প্রদর্শন এবং দীর্ঘমেয়াদি অভিযান চালানোর সামর্থ্য বাড়ছে।
এই বাস্তবতায় পাকিস্তানের কৌশল হলো—কম খরচে বেশি চাপ সৃষ্টি করা। বড় নৌবহর বানানো সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল। কিন্তু দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র, স্বল্পমূল্যের আঘাতকারী ব্যবস্থা, মানবহীন নৌযান এবং প্রতিরক্ষা স্তর একসঙ্গে ব্যবহার করলে সংখ্যায় বড় প্রতিপক্ষকেও ঝুঁকির মধ্যে রাখা যায়। এটিই পাকিস্তানের সমুদ্র অস্বীকার কৌশলের মূল ভিত্তি।
পাকিস্তান শুধু আক্রমণাত্মক ক্ষেপণাস্ত্রেই জোর দিচ্ছে না; প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকেও শক্তিশালী করছে। সম্প্রতি এলওয়াই-৮০ (এন) ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা নৌবহরে যুক্ত করা হয়েছে। বছরের শুরুতে উত্তর আরব সাগরে এক নৌমহড়ায় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পরীক্ষার পাশাপাশি পাকিস্তান নৌবাহিনী ভাসমান লক্ষ্য ধ্বংসে ঘোরাফেরা করে আঘাত হানা গোলাবারুদও পরীক্ষা করে। একই সঙ্গে প্রথমবারের মতো মানবহীন পৃষ্ঠ-যান যুক্ত করার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
এই মানবহীন পৃষ্ঠ-যান ও ঘোরাফেরা করা গোলাবারুদের সংযোজন একটি নতুন প্রবণতার ইঙ্গিত দেয়। ভবিষ্যতের সমুদ্রযুদ্ধে বড় জাহাজের পাশাপাশি ছোট, সস্তা, স্বয়ংক্রিয় বা আধা-স্বয়ংক্রিয় প্ল্যাটফর্মও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। এগুলো একদিকে নজরদারি ও আঘাতের কাজে ব্যবহার করা যায়, অন্যদিকে প্রতিপক্ষের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে চাপের মুখে ফেলা যায়। পাকিস্তানের মতো অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতাসম্পন্ন রাষ্ট্রের জন্য এ ধরনের ব্যবস্থা তুলনামূলকভাবে কার্যকর পথ হতে পারে।
এই কৌশলের পেছনে আরেকটি বড় কারণ হলো ভারতের নৌ অবরোধের সম্ভাবনা নিয়ে পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের উদ্বেগ। মে ২০২৫ সালের সংকটের সময় ভারতীয় নৌবাহিনী অন্তত ৩৬টি যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করেছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে বিমানবাহী রণতরি আইএনএস বিক্রান্তও ছিল, যা পাকিস্তানের উপকূল থেকে ৪০০ নটিক্যাল মাইলের মধ্যে চলে এসেছিল। ভবিষ্যতে দুই দেশের মধ্যে সংকট দেখা দিলে ভারত সমুদ্রপথে চাপ সৃষ্টি বা অবরোধের মতো কৌশল নিতে পারে—এমন আশঙ্কা থেকেই পাকিস্তান উপকূলসংলগ্ন প্রতিরোধ বলয় তৈরিতে আগ্রহী।
তবে অবরোধ কার্যকর করতে হলে ভারতীয় নৌবহরকে পাকিস্তানের উপকূলের তুলনামূলক কাছাকাছি আসতে হবে। সেখানেই পাকিস্তানের নতুন ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ভারতের জন্য ঝুঁকি বাড়াতে পারে। জাহাজবিধ্বংসী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, আকাশ থেকে নিক্ষেপযোগ্য ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র, প্রতিরক্ষা স্তর, মানবহীন নৌযান এবং কম খরচের আঘাতকারী ব্যবস্থা একসঙ্গে কাজ করলে ভারতীয় নৌবহরের পরিকল্পনা জটিল হয়ে উঠতে পারে। প্রতিপক্ষ যত দূরে থাকতে বাধ্য হবে, তার অভিযান তত কম কার্যকর হতে পারে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো দেশীয় অস্ত্র উৎপাদনের ওপর পাকিস্তানের বাড়তি জোর। পি২৮২ স্ম্যাশ এবং তাইমুর এএলসিএম স্থানীয়ভাবে তৈরি হওয়া পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা শিল্পে স্বনির্ভরতার আকাঙ্ক্ষা দেখায়। বাইরের সরবরাহকারীর ওপর নির্ভরতা কমলে যুদ্ধ বা সংকটের সময় অস্ত্র সরবরাহ, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং রক্ষণাবেক্ষণে সুবিধা পাওয়া যায়। একই সঙ্গে দেশীয় উৎপাদন খরচ কমাতেও সহায়তা করতে পারে।
তবে শুধু ক্ষেপণাস্ত্র থাকলেই এই কৌশল সফল হবে না। সমুদ্রে চলমান লক্ষ্য শনাক্ত, অনুসরণ এবং নির্ভুলভাবে আঘাত করতে উন্নত নজরদারি, গোয়েন্দা তথ্য, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং লক্ষ্য নির্ধারণের অবকাঠামো দরকার। এ জন্য পাকিস্তান নৌবাহিনী সি সুলতান দীর্ঘপাল্লার সামুদ্রিক টহল বিমান সংযোজন করছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এই ধরনের বিমান সমুদ্র নজরদারি ও গোয়েন্দা সক্ষমতা বাড়াতে ভূমিকা রাখতে পারে।
সব মিলিয়ে পাকিস্তানের সামুদ্রিক কৌশল এখন এমন এক পথে এগোচ্ছে, যেখানে মূল লক্ষ্য সমুদ্র দখল নয়; বরং প্রতিপক্ষকে নির্দিষ্ট এলাকায় ঝুঁকির মুখে রাখা। ভারতের নৌবহর বড় ও দ্রুত আধুনিক হলেও পাকিস্তান চেষ্টা করছে ক্ষেপণাস্ত্র, মানবহীন ব্যবস্থা, প্রতিরক্ষা স্তর এবং নজরদারির সমন্বয়ে একটি বহুস্তরীয় প্রতিরোধ কাঠামো গড়ে তুলতে। উত্তর আরব সাগরকে কেন্দ্র করে এই কৌশল ভবিষ্যৎ সংকটে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।
পাকিস্তানের জন্য প্রশ্ন এখন শুধু কতটি জাহাজ আছে, তা নয়। বড় প্রশ্ন হলো—দেশটি কত দূর থেকে প্রতিপক্ষের জাহাজকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে, নিজের উপকূল কতটা সুরক্ষিত রাখতে পারে এবং সংকটের সময় প্রতিপক্ষের সিদ্ধান্ত গ্রহণকে কতটা জটিল করে তুলতে পারে। সাম্প্রতিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা ও নৌ সক্ষমতা বৃদ্ধি সেই দিকেই ইঙ্গিত করছে।
সিভি/এইচএম

