যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি ঘনিষ্ঠ মিত্র দেশের কাছে মোট ৮.৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের অস্ত্র বিক্রির অনুমোদন দিয়েছে। ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল যুদ্ধের উত্তেজনা যখন পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে, ঠিক সেই সময় ওয়াশিংটনের এই সিদ্ধান্ত মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
এই অস্ত্র বিক্রির ক্ষেত্রে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো—মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জরুরি পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে কংগ্রেসের পূর্বানুমোদন ছাড়াই চুক্তিগুলো দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সাধারণত এ ধরনের বড় অস্ত্র বিক্রির আগে মার্কিন কংগ্রেসের পর্যালোচনার সুযোগ থাকে। কিন্তু এবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে জরুরি অবস্থা দেখিয়ে সেই প্রক্রিয়া দ্রুত করার পথ নিয়েছেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইসরায়েল ও উপসাগরীয় দেশগুলো একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মুখে পড়েছে। ফেব্রুয়ারির শেষ দিক থেকে চলা সংঘাতে এসব দেশের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা প্রবল চাপের মধ্যে আছে। ফলে তাদের মার্কিন অস্ত্র ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের মজুত দ্রুত কমে যাচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে নতুন অস্ত্র বিক্রির অনুমোদনকে শুধু বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত হিসেবে নয়, বরং যুদ্ধকালীন নিরাপত্তা কৌশলের অংশ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
নতুন অনুমোদিত চুক্তিগুলোর মধ্যে ইসরায়েলের জন্য রয়েছে উন্নত নির্ভুল আঘাতকারী অস্ত্রব্যবস্থা ও সংশ্লিষ্ট সরঞ্জাম, যার মূল্য ৯৯২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। এই ব্যবস্থা মূলত সাধারণ রকেটকে লক্ষ্যভেদী অস্ত্রে রূপান্তর করতে ব্যবহৃত হয়। যুদ্ধক্ষেত্রে দ্রুত, তুলনামূলক কম খরচে এবং নির্ভুল আঘাতের জন্য এ ধরনের অস্ত্র অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কুয়েতের জন্য অনুমোদিত হয়েছে ২.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের যুদ্ধ পরিচালনা ও কমান্ড ব্যবস্থা। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ভাষ্য অনুযায়ী, এই ব্যবস্থা কুয়েতের আকাশ প্রতিরক্ষা শনাক্তকরণ ক্ষমতা বাড়াবে এবং রাডারনির্ভর প্রতিরক্ষা সমন্বয়কে শক্তিশালী করবে। অর্থাৎ সম্ভাব্য ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন হামলার আগাম সতর্কতা, নজরদারি এবং প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার লক্ষ্যেই এই সরঞ্জাম বিক্রি করা হচ্ছে।
কাতারের জন্য অনুমোদিত প্যাকেজ সবচেয়ে বড়গুলোর একটি। দেশটি উন্নত নির্ভুল আঘাতকারী অস্ত্রব্যবস্থা কেনার পাশাপাশি প্যাট্রিয়ট আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মজুত পুনরায় পূরণ করতে পারবে। এই চুক্তির মোট মূল্য প্রায় ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। প্যাট্রিয়ট ব্যবস্থা যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম উন্নত প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি, যা আকাশপথে আসা ক্ষেপণাস্ত্র ও অন্যান্য হামলাকারী বস্তু প্রতিহত করতে ব্যবহৃত হয়।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের জন্যও ১৪৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের উন্নত নির্ভুল আঘাতকারী অস্ত্রব্যবস্থা কেনার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। যদিও এই অঙ্ক অন্য চুক্তিগুলোর তুলনায় ছোট, তবু চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে এটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা প্রস্তুতির অংশ হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।
শুক্রবার প্রকাশিত ধারাবাহিক ঘোষণায় মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানায়, অস্ত্র বিক্রির জন্য জরুরি পরিস্থিতির বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে এবং এটি যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা স্বার্থের সঙ্গে সম্পর্কিত। এই ব্যাখ্যার মাধ্যমে অস্ত্র রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ আইনের অধীনে কংগ্রেসের সাধারণ পর্যালোচনা প্রক্রিয়া এড়িয়ে দ্রুত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
এই সিদ্ধান্ত মার্কিন নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যের মিত্রদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বজায় রাখতে চাইছে, অন্যদিকে যুদ্ধ দীর্ঘ হলে নিজস্ব অস্ত্র মজুত নিয়েও ওয়াশিংটনের উদ্বেগ বাড়ছে। কারণ ইরান যুদ্ধের কারণে শুধু ইসরায়েল বা উপসাগরীয় দেশগুলোই নয়, যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভান্ডারও চাপের মুখে পড়েছে।
মার্চ মাসেও মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত ও জর্ডানের জন্য ১৬.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের পৃথক অস্ত্র বিক্রির অনুমোদন দিয়েছিল। সেসব চুক্তির মধ্যে ছিল ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র, রাডার ব্যবস্থা এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের জন্য এফ-১৬ যুদ্ধবিমান সংশ্লিষ্ট সরঞ্জাম। কুয়েতের জন্য ছিল আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা রাডার ব্যবস্থা।
অর্থাৎ সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বরং এটি মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অবস্থান পুনর্গঠন এবং মিত্রদের প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি দ্রুত বাড়ানোর ধারাবাহিক অংশ। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মুখে উপসাগরীয় দেশগুলো বুঝতে পারছে, শুধু কূটনৈতিক সম্পর্ক নয়, কার্যকর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাই এখন তাদের নিরাপত্তার প্রধান ভরসা।
তবে এই অস্ত্র বিক্রির আরেকটি বড় দিক রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন অস্ত্রের ব্যাপক ব্যবহার ওয়াশিংটনের বৈশ্বিক সামরিক প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। বিশেষ করে তাইওয়ানকে ঘিরে চীনের সঙ্গে সম্ভাব্য সংঘাতের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র কতটা প্রস্তুত থাকবে, তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বেইজিং তাইওয়ানকে নিজেদের অংশ মনে করে, আর যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে তাইওয়ানের নিরাপত্তা প্রশ্নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
গত মাসে প্রকাশিত একটি কৌশলগত গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান যুদ্ধের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র মজুত আপাতত যথেষ্ট হলেও চীনের মতো শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ভবিষ্যৎ সংঘাতের জন্য আরও বড় প্রস্তুতি প্রয়োজন হতে পারে। প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে, যুদ্ধের আগেই অস্ত্রের মজুত পর্যাপ্ত ছিল না; আর বর্তমান ব্যবহারের পর সেই ঘাটতি ভবিষ্যৎ সামরিক অভিযানে সীমাবদ্ধতা তৈরি করতে পারে।
এই পরিস্থিতি দেখাচ্ছে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ শুধু আঞ্চলিক সংঘাত নয়; এটি যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক সামরিক কৌশল, অস্ত্র উৎপাদন ক্ষমতা, মিত্রনীতি এবং ভবিষ্যৎ শক্তির ভারসাম্যের সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত। একদিকে ওয়াশিংটন ইসরায়েল ও উপসাগরীয় মিত্রদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চাইছে, অন্যদিকে তাকে ভাবতে হচ্ছে—একই সময়ে যদি এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে বড় সংকট তৈরি হয়, তবে তার সামরিক প্রস্তুতি কতটা টেকসই থাকবে।
সব মিলিয়ে ৮.৬ বিলিয়ন ডলারের এই অস্ত্র বিক্রি মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের বাস্তবতা, যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রনির্ভর নিরাপত্তা নীতি এবং বৈশ্বিক সামরিক প্রতিযোগিতার একটি বড় ইঙ্গিত। কংগ্রেসের স্বাভাবিক পর্যালোচনা প্রক্রিয়া পাশ কাটিয়ে জরুরি অনুমোদন দেওয়ার সিদ্ধান্ত প্রমাণ করে, ওয়াশিংটন পরিস্থিতিকে শুধু বাণিজ্যিক বা কূটনৈতিক ইস্যু হিসেবে দেখছে না; বরং এটি এখন সরাসরি নিরাপত্তা সংকট হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সিভি/এইচএম

