ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান অচলাবস্থাকে অনেকেই শুধু পরমাণু আলোচনার ব্যর্থতা হিসেবে দেখছেন। কিন্তু বাস্তবতা আরও গভীর। এখানে শুধু একটি চুক্তি সই হবে কি হবে না, সেটাই প্রশ্ন নয়। প্রশ্ন হলো—দুই পক্ষই কি এমন অবস্থানে পৌঁছে গেছে, যেখানে কেউই নিজেকে পরাজিত হিসেবে দেখতে রাজি নয়?
সোমবার ইরান যুক্তরাষ্ট্রকে একটি প্রস্তাব দেয়। প্রস্তাবটি ছিল—পরমাণু আলোচনা চলতে থাকুক, আর বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র অবরোধ তুলে নিলে ইরান হরমুজ প্রণালী খুলে দেবে। কিন্তু বুধবার ডোনাল্ড ট্রাম্প সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি জানান, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের শর্ত না মানা পর্যন্ত অবরোধ চলবে। তাঁর বক্তব্যের মূল সুর ছিল, ইরানকে শেষ পর্যন্ত নতি স্বীকার করতেই হবে।
এই অবস্থান থেকেই বোঝা যায়, ওয়াশিংটন এখনো মনে করছে চাপ বাড়ালে তেহরান পিছু হটবে। কিন্তু ইরানের হিসাব আলাদা। ইরান মনে করছে, যুদ্ধ, অবরোধ, বিমান হামলা ও আন্তর্জাতিক চাপের মধ্যেও তারা রাষ্ট্রীয় কাঠামো ধরে রেখেছে। তাই তারা মনে করছে, যুদ্ধক্ষেত্রে যে দাবি যুক্তরাষ্ট্র আদায় করতে পারেনি, আলোচনার টেবিলে সেটি সহজে আদায় করা সম্ভব নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাখ্যা হলো, ইরানের ভেতরে সামরিক নেতৃত্ব ও আলোচনাকারীদের মধ্যে বড় ধরনের বিভাজন আছে। ওয়াশিংটনের ধারণা, ইরানের কঠোরপন্থীরা চুক্তির পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই ধারণার ভিত্তিতে যুক্তরাষ্ট্র এমন হামলার কথাও ভাবছে, যা সরাসরি ইরানের সামরিক সক্ষমতার বদলে শাসনব্যবস্থার সেই অংশকে লক্ষ্য করবে, যাদের তারা চুক্তিবিরোধী মনে করে।
কিন্তু এই ধারণা কতটা বাস্তবসম্মত, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বহুবার হামলা, নিষেধাজ্ঞা ও নেতৃত্বের ক্ষতির মুখোমুখি হয়েছে। তবু প্রতিষ্ঠানটি ভেঙে পড়েনি। শুধু কয়েকজন শীর্ষ ব্যক্তিকে সরিয়ে দিলেই পুরো ব্যবস্থার অবস্থান বদলে যাবে—এমন ধারণা খুব সরলীকৃত। কারণ কঠোরপন্থী চিন্তা শুধু একটি বাহিনী বা কয়েকজন নেতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি ইরানের ক্ষমতার বিস্তৃত কাঠামোর ভেতরে ছড়িয়ে আছে।
আসলে চুক্তি না হওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ সম্ভবত এটিই—যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান দুপক্ষই মনে করছে তারা জিতেছে। ট্রাম্প প্রশাসনের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, বহু ক্ষেপণাস্ত্র এবং সামরিক ও শিল্প সক্ষমতার বড় অংশ ধ্বংস করেছে। অন্যদিকে ইরান মনে করছে, তারা এমন একটি যুদ্ধ টিকে গেছে, যার লক্ষ্য ছিল শাসনব্যবস্থাকে দুর্বল করা বা পতনের দিকে ঠেলে দেওয়া। শুধু তাই নয়, তারা পারস্য উপসাগর, ইসরায়েল এবং হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে নিজেদের চাপ সৃষ্টির ক্ষমতাও দেখিয়েছে।
এই মনস্তাত্ত্বিক অবস্থানই আলোচনাকে কঠিন করে তুলেছে। কোনো পক্ষই এখন এমন চুক্তি করতে চাইছে না, যা তাদের নিজ দেশের মানুষের কাছে পরাজয় হিসেবে দেখা যেতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র চাইছে ইরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ পুরোপুরি বন্ধ করুক এবং ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি সীমিত করুক। কিন্তু ইরান বহু বছর ধরে এসব দাবি প্রত্যাখ্যান করে আসছে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে দুইবার যুদ্ধে জড়ানোর পরও তারা এ জায়গা থেকে সরে আসেনি।
ইসলামাবাদে আলোচনার সময় জে ডি ভ্যান্সের নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনাকারীরা দেখতে পান, পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে মার্কিন দাবির প্রতি ইরান কোনো সাড়া দিচ্ছে না। যুদ্ধ আবার শুরু না করে ট্রাম্প তখন অবরোধের পথে যান। ধারণা ছিল, কয়েক দিনের চাপেই ইরান নরম হবে। কিন্তু ইরানের অতীত আচরণ দেখলে এই ধারণা দুর্বল মনে হয়।
অবরোধের আরেকটি লক্ষ্য ছিল ইরানের তেলশিল্পকে দ্রুত চাপে ফেলা। ২৭ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট সামাজিক মাধ্যমে দাবি করেন, অবরোধের কারণে ইরানের তেল উৎপাদন বন্ধের পথে। কিন্তু ইরান কয়েক দশক ধরে নিষেধাজ্ঞার মধ্যে টিকে থাকার অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। কম চাহিদা, বিকল্প বাণিজ্যপথ ও সীমিত বাজার—এসবের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার দক্ষতা তাদের আছে। যুদ্ধের শুরুতে তেল রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল হওয়ায় ইরান আর্থিক সুবিধাও পেয়েছিল।
তেহরানের হিসাব সম্ভবত এমন—অর্থনৈতিক কষ্ট সহ্য করার ক্ষেত্রে তারা যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে বেশি সময় ধরে থাকতে পারবে। কারণ যুক্তরাষ্ট্রে শরৎকালের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে থাকলে ট্রাম্প প্রশাসন অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়তে পারে। তেলের দাম, মূল্যস্ফীতি ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়লে সেই চাপ আরও বাড়বে।
তবে ইরান শুধু অপেক্ষা করবে, এমনটাও নিশ্চিত নয়। যদি যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদি অবরোধে থাকে, তাহলে ইরান অন্য কৌশল নিতে পারে। যেমন, হুতিদের মাধ্যমে বাব আল-মান্দেব প্রণালী বন্ধের চেষ্টা হতে পারে। এই প্রণালী লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করে এবং সুয়েজ খালগামী বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ সংকট শুধু হরমুজে আটকে থাকবে না; এটি বৈশ্বিক বাণিজ্যপথে আরও বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকলে এর প্রভাব শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক। উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি ও পরিশোধিত তেলজাত পণ্য এত দিন বাজারে পৌঁছাচ্ছিল, কারণ যুদ্ধের আগে অনেক জাহাজ ও ট্যাংকার প্রণালী পেরিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু এখন সেই চলাচল থেমে গেলে মজুত কমতে থাকবে। সার, পেট্রোকেমিক্যাল এবং পরিশোধিত জ্বালানির সংকট দেখা দিতে পারে। বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমান তেল সরবরাহ ধাক্কা ইতিমধ্যে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ধাক্কা হয়ে উঠতে পারে। পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র হয়তো মনে করতে পারে, এই সংকট বিশ্বের অন্য দেশগুলোকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করবে, যুক্তরাষ্ট্রকে তুলনামূলক কম। কিন্তু জ্বালানির বাজার আন্তঃসংযুক্ত। তাই গ্যাসের দাম, পরিবহন ব্যয়, খাদ্য উৎপাদন খরচ এবং মূল্যস্ফীতির ওপর প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রকেও এড়াতে দেবে না। বিশেষ করে নির্বাচনী রাজনীতির সময় এসব অর্থনৈতিক চাপ প্রশাসনের জন্য বড় সমস্যা হয়ে উঠতে পারে।
এখন ট্রাম্পের সামনে কয়েকটি কঠিন পথ আছে। প্রথম পথ হলো—ইরানের সঙ্গে এমন একটি চুক্তি করা, যা ২০১৫ সালের পরমাণু চুক্তির চেয়ে শক্তিশালী হবে। এতে দীর্ঘ সময়সীমা ও ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের ওপর বেশি সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে। কিন্তু এতে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি পুরোপুরি বাতিল হবে না এবং ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির প্রশ্নও অমীমাংসিত থাকতে পারে। হরমুজ প্রণালী খুলে যাবে, কিন্তু ভবিষ্যতে ইসরায়েলি হামলা হলে ইরান আবার সেটি বন্ধ করার সক্ষমতা ধরে রাখবে।
দ্বিতীয় পথ হলো—ইরানের সাম্প্রতিক প্রস্তাবের মতো একটি সীমিত সমঝোতা মেনে নেওয়া। অর্থাৎ হরমুজ প্রণালী খুলবে, কিন্তু পরমাণু কর্মসূচি, ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি বা নিষেধাজ্ঞা—কোনোটিই পূর্ণভাবে নিষ্পত্তি হবে না। এতে যুক্তরাষ্ট্র অবরোধ তুলে নেবে, কিন্তু বড় কোনো কৌশলগত অর্জন পাবে না। ইরানও প্রণালী খুলবে, কিন্তু নিষেধাজ্ঞা থেকে মুক্তি পাবে না।
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু মিত্র, বিশেষ করে ইসরায়েল ও সংযুক্ত আরব আমিরাত, দ্বিতীয় পথকে তুলনামূলকভাবে বেশি পছন্দ করতে পারে। কারণ তারা ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ও আঞ্চলিক প্রভাব নিয়ে বেশি উদ্বিগ্ন। তারা চাইতে পারে না এমন কোনো পরমাণু চুক্তি হোক, যা নিষেধাজ্ঞা তুলে দেয় কিন্তু ক্ষেপণাস্ত্র বা আঞ্চলিক মিত্রগোষ্ঠীকে সীমিত করে না।
ইসরায়েলের হিসাবও আলাদা হতে পারে। পরমাণু চুক্তি না থাকলে ভবিষ্যতে ইরানে আবার হামলার সুযোগ রাখা যায়। একই সঙ্গে নিষেধাজ্ঞা না উঠলে ইরানের অর্থনীতি দুর্বল থাকবে, যা দীর্ঘমেয়াদে শাসনব্যবস্থাকে চাপে ফেলতে পারে। তাই ইসরায়েল হয়তো এমন অবস্থান চাইবে, যেখানে হরমুজ খুলবে, কিন্তু ইরান কোনো বড় কূটনৈতিক স্বস্তি পাবে না।
এই সংকটের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, সামরিক হামলা সব সময় রাজনৈতিক লক্ষ্য পূরণ করতে পারে না। যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের মাধ্যমে ইরানকে এমন আঘাত দিতে চেয়েছিল, যা থেকে তেহরান আর উঠে দাঁড়াতে পারবে না। কিন্তু বাস্তবে যুদ্ধ ইরানের সামরিক সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত করলেও, তাকে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার ও উপসাগরীয় নিরাপত্তার ওপর আরও বড় দরকষাকষির ক্ষমতা দিয়েছে।
সীমিত নতুন হামলা হয়তো সাময়িক শক্তির প্রদর্শন হবে, কিন্তু তা মূল সমস্যার সমাধান করবে না। ইরান যদি আবার পাল্টা জবাব দেয়, তাহলে সংকট আরও বিস্তৃত হতে পারে। আর যদি যুদ্ধ কয়েক দিনের মধ্যেও থেমে যায়, তবুও ট্রাম্প আবার একই জায়গায় ফিরে আসবেন—ইরান মার্কিন শর্ত মানছে না, হরমুজ প্রশ্ন অমীমাংসিত, আর বৈশ্বিক অর্থনীতি ঝুঁকিতে।
তাই এই অচলাবস্থার মূল কারণ কেবল ইরানের অভ্যন্তরীণ কঠোরপন্থী রাজনীতি নয়। মূল কারণ হলো, দুই পক্ষই নিজেদের জয়ী ভাবছে এবং কেউই এমন সমঝোতা করতে চাইছে না, যা পরাজয়ের স্বীকারোক্তি মনে হতে পারে। এই মনস্তত্ত্ব না বদলালে অবরোধ, হামলা বা সীমিত আলোচনার কোনোটিই স্থায়ী সমাধান আনবে না।

