ইরান যুদ্ধ শুধু মধ্যপ্রাচ্যের একটি আঞ্চলিক সংঘাত হয়ে থাকেনি। খুব দ্রুত এটি বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক ভারসাম্যের ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে। যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা যত বেড়েছে, ততই দূরের দেশগুলোও বুঝতে পেরেছে—একটি গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ বন্ধ হয়ে গেলে পুরো বিশ্ব কতটা অস্থির হয়ে উঠতে পারে।
জেনেভায় ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের শান্তি আলোচনার পটভূমিতে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি হঠাৎ ইরানে বিমান হামলা শুরু করে ইসরায়েল ও তাদের ঘনিষ্ঠ মিত্র যুক্তরাষ্ট্র। এই হামলার পর পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। যুদ্ধের শুরুতেই ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়। আর এখান থেকেই শুরু হয় বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের নতুন অস্থিরতা।
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের তেল ও তরলীকৃত গ্যাস সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বৈশ্বিক জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত গ্যাস আমদানি-রপ্তানির প্রায় ২০ শতাংশ এই পথ দিয়ে হয়ে থাকে। তাই এই পথ বন্ধ হয়ে যাওয়া মানে শুধু কয়েকটি দেশের সমস্যা নয়; বরং পুরো বিশ্ব অর্থনীতির জন্য বড় ধাক্কা।
প্রথমদিকে হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়ার ঘোষণা এলেও ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টাপাল্টি অবরোধে বাস্তবে জাহাজ চলাচল প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে আসে। এই অচলাবস্থা কাটাতে নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও স্থায়ী সমাধান আসেনি। ফলে তেল-গ্যাসনির্ভর দেশগুলো এক কঠিন বাস্তবতার মুখে দাঁড়ায়—জ্বালানির জন্য একক কোনো পথ বা অঞ্চলের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ভয়াবহ ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
এই সংকটের মধ্যেই চীনের জন্য তৈরি হয় এক বড় সুযোগ। বিশ্ব যখন তেল ও গ্যাসের বিকল্প খুঁজতে বাধ্য হচ্ছে, তখন চীন ইতোমধ্যে সৌর প্রযুক্তি, ব্যাটারি, বৈদ্যুতিক গাড়ি এবং বায়ু-চালিত বিদ্যুৎ প্রযুক্তিতে শক্ত অবস্থান তৈরি করে ফেলেছে। বহু বছর ধরে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা, শিল্পনীতি এবং ব্যাপক উৎপাদন সক্ষমতার মাধ্যমে চীন এই খাতগুলোকে শক্তিশালী করেছে। এখন সেই প্রস্তুতির ফল পাচ্ছে বেইজিং।
গত মার্চে সৌর প্রযুক্তি, সৌর ব্যাটারি ও বৈদ্যুতিক গাড়ি রপ্তানিতে নতুন রেকর্ড গড়ে চীন। জ্বালানি গবেষণা প্রতিষ্ঠান এম্বারের তথ্য অনুযায়ী, তেল সরবরাহে বড় সংকট তৈরি হওয়ায় অনেক দেশ দ্রুত পরিবেশবান্ধব জ্বালানির দিকে ঝুঁকছে। অর্থাৎ, আগে যে পরিবর্তন ধীরে ধীরে হওয়ার কথা ছিল, যুদ্ধ সেই পরিবর্তনকে দ্রুততর করেছে।
এশিয়ার কয়েকটি দেশ ইতোমধ্যে জ্বালানি সাশ্রয়ের জন্য কর্মঘণ্টা কমানো, তেল সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ এবং খরচ কমানোর মতো পদক্ষেপ নিচ্ছে। কিন্তু এসব ব্যবস্থা সাময়িক। দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতে হবে। আর এখানেই চীনের শক্তি সবচেয়ে বেশি।
বর্তমানে বৈদ্যুতিক পরিবহন, বায়ু-চালিত টারবাইন এবং সৌর প্যানেল উৎপাদনে চীন শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে। গত ২৩ এপ্রিল এম্বারের প্রতিবেদনে বলা হয়, চীন শুধু মার্চ মাসেই ৬৮ গিগাওয়াট সৌর প্রযুক্তি রপ্তানি করেছে। আগের সর্বোচ্চ রেকর্ডের তুলনায় এটি ৫০ শতাংশ বেশি। একই সঙ্গে চীনের সৌর প্রযুক্তি আমদানিতে নতুন রেকর্ড গড়েছে ৫০টি দেশ।
এই চাহিদা বৃদ্ধির পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে এশিয়া ও আফ্রিকার উন্নয়নশীল দেশগুলো। এসব দেশের অনেকেরই তেল আমদানির ওপর বড় নির্ভরতা রয়েছে। কিন্তু হরমুজ সংকট দেখিয়ে দিয়েছে, আমদানি করা জ্বালানির ওপর নির্ভরতা অর্থনীতি, পরিবহন, শিল্প ও সাধারণ মানুষের জীবনে বড় চাপ তৈরি করতে পারে। তাই সৌরবিদ্যুৎ এখন শুধু পরিবেশ রক্ষার বিষয় নয়; এটি জাতীয় নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার বিষয়েও পরিণত হয়েছে।
এম্বারের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক ইউয়ান গ্রাহামের মতে, জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরতা এবং হঠাৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ার ভয় সৌর প্রযুক্তির জনপ্রিয়তা বাড়াচ্ছে। তাঁর বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, বর্তমান সংকট অনেক দেশের নীতিনির্ধারকদের চিন্তায় বড় পরিবর্তন এনেছে। আগে সৌরশক্তিকে অনেকেই ব্যয়বহুল বিকল্প হিসেবে দেখলেও এখন সেটিকে ভবিষ্যতের নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
গত বছরের মার্চের তুলনায় এ বছর চীন সৌর প্যানেল, ব্যাটারি ও বৈদ্যুতিক গাড়ির রপ্তানি ৭০ শতাংশ বাড়িয়েছে। চীনের শুল্ক বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এই তিন খাত এখন দেশটির অর্থনীতির নতুন শক্তি হিসেবে উঠে এসেছে। চীনে এগুলোকে বলা হচ্ছে ‘নব্য তিন’। আগে পোশাক, ঘরোয়া বৈদ্যুতিক যন্ত্র ও আসবাবপত্র চীনের রপ্তানির বড় অংশ দখল করে ছিল। এখন সেই জায়গায় দ্রুত উঠে আসছে সৌর প্যানেল, ব্যাটারি ও বৈদ্যুতিক গাড়ি।
গত মার্চে শুধু ব্যাটারি রপ্তানি থেকেই চীন ১০ বিলিয়ন ডলার আয় করেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, অস্ট্রেলিয়া ও ভারতের বাজারে চীনের ব্যাটারি খাত বিশেষভাবে ভালো করছে। এর অর্থ হলো, চীন এখন শুধু পণ্য রপ্তানি করছে না; বরং বিশ্বের জ্বালানি রূপান্তরের অবকাঠামোও সরবরাহ করছে।
এই পরিবর্তনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো রাজনৈতিক প্রভাব। কোনো দেশ যখন তার জ্বালানি অবকাঠামোর জন্য অন্য দেশের প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল হয়, তখন দুই দেশের সম্পর্কও নতুন মাত্রা পায়। এতদিন চীনকে অনেক দেশ কম খরচের উৎপাদক হিসেবে দেখত। কিন্তু এখন অনেক দেশ চীনকে জ্বালানি রূপান্তরের দীর্ঘমেয়াদি অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করছে। ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুরের জ্বালানি শিক্ষা অনুষদের জ্যেষ্ঠ গবেষণা ফেলো জিওং ওন কিমও এমন মত দিয়েছেন।
ইরান সংকট বিশ্বনেতাদের সামনে একটি কঠিন প্রশ্ন তুলে ধরেছে—জ্বালানি নিরাপত্তা কি শুধু বেশি তেল মজুত রাখলেই নিশ্চিত হয়? নাকি নিজস্ব সৌর, বায়ু ও ব্যাটারি সক্ষমতা তৈরি করাই ভবিষ্যতের সঠিক পথ? বহু দেশ এখন দ্বিতীয় পথের দিকে তাকাচ্ছে। জলবায়ু সম্মেলনে কার্বন নিঃসরণ কমানোর অঙ্গীকার বহু বছর ধরেই করা হচ্ছে, কিন্তু বাস্তবে অনেক দেশ এখনও জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। এবার অর্থনৈতিক চাপ তাদের বাস্তব সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করছে।
যুক্তরাজ্যের জ্বালানিমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ড গত সপ্তাহে গণমাধ্যমকে বলেছেন, পাঁচ বছরেরও কম সময়ের মধ্যে দ্বিতীয়বারের মতো জীবাশ্ম জ্বালানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। তাঁর মতে, এটি যুক্তরাজ্যের জন্য স্পষ্ট শিক্ষা—জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতে হবে এবং টেকসই জ্বালানির যুগ শুরু করতে হবে।
এই পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের অবস্থান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কয়েক বছর আগে থেকেই পাকিস্তান চীন থেকে সৌর প্যানেল আমদানি ব্যাপকভাবে বাড়ায়। ফলে বর্তমান তেল-গ্যাস সংকটেও সৌরবিদ্যুৎ দেশটির জন্য কিছুটা স্বস্তি তৈরি করেছে। সৌর প্যানেল বসাতে প্রথমে বড় খরচ হলেও একবার তা চালু হলে দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি আমদানির ব্যয় কমাতে পারে। পাকিস্তান এখন সেই সুবিধা পাচ্ছে। এশিয়ার অন্য দেশগুলোও এখন বুঝতে পারছে, টেকসই জ্বালানিতে বিনিয়োগ বিলাসিতা নয়; এটি ভবিষ্যতের প্রয়োজন।
চীনের শক্তি শুধু সৌর প্যানেলে সীমাবদ্ধ নয়। বৈদ্যুতিক গাড়িতেও দেশটির অগ্রগতি দ্রুত। চীনের বিওয়াইডি এখন বৈদ্যুতিক গাড়ির ক্ষেত্রে বিশ্ববাজারে বড় নাম। এম্বার অ্যানালিস্টের হিসাব অনুযায়ী, গত বছর বৈদ্যুতিক গাড়ির জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির কারণে বিশ্বজুড়ে ১৭ লাখ ব্যারেল তেল কম ব্যবহার হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে সংকট ঘনীভূত হওয়ার পর চীনে তৈরি বৈদ্যুতিক গাড়ির অর্ডার ও বিক্রি বেড়েছে বলে চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যম জানিয়েছে।
গত মার্চে চীনের বৈদ্যুতিক ও হাইব্রিড গাড়ির রপ্তানি আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যায়। চীনের যাত্রীবাহী গাড়ি মালিকদের সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মার্চের তুলনায় এ বছরের মার্চে এই রপ্তানি ১৪০ শতাংশ বেড়েছে। এই পরিসংখ্যান দেখায়, বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট শুধু সৌর প্রযুক্তি নয়, পরিবহন খাতেও বড় পরিবর্তনের গতি বাড়িয়েছে।
সেন্টার ফর রিসার্চ অন এনার্জি অ্যান্ড ক্লিন এয়ার-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা লরি মিলিভিরতা মনে করেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দেশগুলোকে বিকল্প জ্বালানি উৎস খুঁজতে আরও উৎসাহিত করেছে। তাঁর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, একদিকে সৌরশক্তি ও ব্যাটারির দাম কমছে, অন্যদিকে জীবাশ্ম জ্বালানির বাজার অস্থির হয়ে উঠছে। ফলে অনেক দেশের জন্য সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হয়েছে—তারা এখন টেকসই জ্বালানির দিকে এগোতে চাইছে।
সব মিলিয়ে ইরান যুদ্ধ চীনের জন্য এক অপ্রত্যাশিত সুযোগ তৈরি করেছে। যুদ্ধ, অবরোধ ও জ্বালানি সংকট বিশ্ব অর্থনীতির জন্য বিপজ্জনক হলেও চীন এই পরিস্থিতিতে নিজের প্রস্তুতির সুফল পাচ্ছে। বহু বছর ধরে যে খাতে বিনিয়োগ করেছে, এখন সেই খাতই তার অর্থনীতি, রপ্তানি ও ভূরাজনৈতিক প্রভাব বাড়াচ্ছে।
তবে এই বাস্তবতা শুধু চীনের সাফল্যের গল্প নয়। এটি বাকি বিশ্বের জন্যও একটি সতর্কবার্তা। জ্বালানি নিরাপত্তা এখন আর শুধু তেলক্ষেত্র, গ্যাস পাইপলাইন বা সমুদ্রপথের বিষয় নয়। ভবিষ্যতের নিরাপত্তা নির্ভর করবে কে কত দ্রুত সৌরশক্তি, ব্যাটারি, বৈদ্যুতিক পরিবহন ও স্থানীয় উৎপাদন সক্ষমতায় এগোতে পারে তার ওপর।
ইরান যুদ্ধ তাই একদিকে সংকট, অন্যদিকে শিক্ষা। যারা এখনও জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল, তাদের জন্য এটি সতর্ক সংকেত। আর চীনের জন্য এটি প্রমাণ করেছে—আগেভাগে প্রস্তুতি নিলে বৈশ্বিক সংকটও অর্থনৈতিক সুযোগে পরিণত হতে পারে।
সিভি/এইচএম

