ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজনীতিতে বহু বছর ধরে একক আধিপত্যের প্রতীক ছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। লড়াকু মনোভাব, দৃঢ় নেতৃত্ব আর জনভিত্তির ওপর ভর করে তিনি প্রায় দেড় দশক রাজ্যের রাজনীতিকে নিজের নিয়ন্ত্রণে রেখেছিলেন। কিন্তু ২০২৬ সালের এই নির্বাচনে হঠাৎ করেই সেই চিত্র বদলে গেছে। দীর্ঘদিনের শক্ত ঘাঁটি ভেঙে পড়ে তার দল এখন এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি।
এই পরাজয় শুধু একটি নির্বাচনী ফল নয়; এটি একটি যুগের পরিবর্তনের ইঙ্গিত। বহুদিন ধরে রাজ্যের প্রধান শক্তি হিসেবে থাকা তৃণমূল কংগ্রেস এখন কার্যত দ্বিতীয় সারিতে নেমে এসেছে। বিপরীতে ভারতীয় জনতা পার্টি এই নির্বাচনে শক্তিশালী উত্থান ঘটিয়ে রাজ্যের ক্ষমতার কেন্দ্র দখলের পথে এগিয়ে গেছে।
৭১ বছর বয়সী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অবশ্য এই পরাজয়কে সহজভাবে মেনে নেননি। তিনি সরাসরি অভিযোগ তুলেছেন যে নির্বাচন ছিল ‘অনৈতিক’ এবং এতে ব্যাপক কারচুপি হয়েছে। তার বক্তব্যে স্পষ্ট ক্ষোভ—নির্বাচন কমিশনকে তিনি পক্ষপাতদুষ্ট বলে আখ্যা দিয়েছেন এবং দাবি করেছেন, শতাধিক আসন তার দলের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে। এই অভিযোগের মাধ্যমে তিনি মূলত নিজের সমর্থকদের মধ্যে লড়াইয়ের মনোভাব জিইয়ে রাখতে চাইছেন।
এক সময়ের অপ্রতিরোধ্য এই নেত্রী কীভাবে এই অবস্থায় এলেন, সেটি বোঝার জন্য পেছনের কয়েকটি বছর বিশ্লেষণ করা জরুরি। ২০১৪, ২০১৯ ও ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচন এবং ২০১৬ ও ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ধারাবাহিক সাফল্য পেয়েছিলেন তিনি। তবে সেই সাফল্যের মধ্যেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা ধীরে ধীরে কঠিন হয়ে উঠছিল। বিশেষ করে বিজেপির সাংগঠনিক বিস্তার এবং ধারাবাহিক প্রচারণা রাজ্যের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করছিল।
সংখ্যার হিসাবও সেই পরিবর্তনের প্রমাণ দেয়। ২০১৬ সালে যেখানে বিজেপির আসন ছিল মাত্র ৩টি, সেখানে কয়েক বছরের ব্যবধানে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৭৭-এ। আর ২০২৬ সালের নির্বাচনে তারা ২০৬টি আসন দখল করে প্রায় একতরফা আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছে। এই ফলাফল স্পষ্ট করে দেয় যে ভোটারদের বড় একটি অংশ তাদের অবস্থান বদলেছে।
তবে এই পরিবর্তন হঠাৎ করে হয়নি। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার ফলে প্রশাসনিক ক্লান্তি, দলীয় অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, প্রার্থী নির্বাচনে বিতর্ক এবং জনসাধারণের প্রত্যাশা পূরণে ঘাটতি—সব মিলিয়ে তৃণমূলের ভেতরে একটি অস্থিরতা তৈরি হচ্ছিল। সেই সুযোগটিই কাজে লাগিয়েছে বিজেপি।
পরাজয়ের পর মমতার বক্তব্যে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে, তা হলো ‘বাঙালি বনাম বহিরাগত’ রাজনীতি। অতীতে এই কৌশল তাকে সাফল্য এনে দিয়েছিল। তাই বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, তিনি আবারও এই আবেগঘন ইস্যুকে সামনে এনে নিজের সমর্থনভিত্তি পুনর্গঠনের চেষ্টা করবেন। একই সঙ্গে তিনি নিজেকে ‘বাংলার রক্ষক’ হিসেবে উপস্থাপন করতে পারেন।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, এবার তার সামনে চ্যালেঞ্জ অনেক বড়। ক্ষমতার বাইরে থেকে একটি শক্তিশালী সংগঠনকে ধরে রাখা সহজ নয়। দলীয় ভাঙন, নেতাকর্মীদের মনোবল ধরে রাখা এবং সম্ভাব্য দলবদল ঠেকানো—এই তিনটি বিষয় এখন তার জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রশাসনিক ক্ষমতা হারানোর ফলে তার রাজনৈতিক কার্যক্রমের পরিসর সংকুচিত হতে পারে। এতদিন যে প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি তার পেছনে ছিল, এখন তা আর নেই। ফলে তাকে আবার রাজপথের রাজনীতিতে ফিরে যেতে হতে পারে—যেখানে তার পুরোনো দক্ষতা অবশ্যই কাজে লাগতে পারে, কিন্তু প্রতিপক্ষ এবার অনেক বেশি শক্তিশালী।
এই প্রেক্ষাপটে বড় প্রশ্নটি থেকেই যায়—এটাই কি মমতার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায়, নাকি এটি নতুন লড়াইয়ের সূচনা? ইতিহাস বলছে, তিনি কখনো সহজে হাল ছাড়েন না। বারবার প্রতিকূল পরিস্থিতি থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর নজির রয়েছে তার। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে কঠিন।
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি এখন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে নতুন শক্তির উত্থান, অন্যদিকে পুরোনো নেতৃত্বের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার সংগ্রাম। এই লড়াইয়ের ফলাফলই নির্ধারণ করবে আগামী দিনের রাজনৈতিক মানচিত্র। আর সেই গল্পের কেন্দ্রে এখনো রয়েছেন একজন—মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
সিভি/এইচএম

