জ্বালানি নিরাপত্তার অর্থ এখন আর শুধু তেল ও গ্যাসের সরবরাহ নিশ্চিত করা নয়; বরং ভবিষ্যতের শক্তি নির্ভর করবে সস্তা, নির্ভরযোগ্য ও বৃহৎ পরিসরের বিদ্যুৎব্যবস্থার ওপর। এই বাস্তবতা চীন দ্রুত বুঝে কৌশল সাজালেও ইউরোপ এখনো সেই গতিতে এগোতে পারছে না।
ইরান যুদ্ধ বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে। হরমুজ প্রণালী ঘিরে উত্তেজনা তেলের বাজারকে অস্থির করেছে, আর তার প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে আমদানি-নির্ভর অর্থনীতিগুলোর ওপর। এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের তেল ও গ্যাস কোম্পানিগুলো চলতি বছরে অন্তত ৬০ বিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত মুনাফা করতে পারে। একই সময়ে রাশিয়া পেতে পারে ১০০ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত বাড়তি রাজস্ব। কিন্তু এই লাভের বিপরীতে অধিকাংশ অর্থনীতি ধীর প্রবৃদ্ধি, বাড়তি মূল্যস্ফীতি এবং দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ সুদের হারের চাপের মুখে পড়ছে।
সবচেয়ে বড় দুর্বলতা দেখা যাচ্ছে হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে। এই পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা এশিয়ার উপসাগরীয় জ্বালানির ওপর নির্ভরশীলতাকে স্পষ্ট করেছে। কিন্তু শুধু এশিয়া নয়, ইউরোপও এর বড় মূল্য দিচ্ছে। ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ইউরোপীয় ইউনিয়ন জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানিতে অতিরিক্ত ২৪ বিলিয়ন ইউরো, অর্থাৎ ২৮ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে। এই অতিরিক্ত ব্যয় দেখিয়ে দিচ্ছে, জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে ইউরোপের দীর্ঘদিনের নীতি এখন কতটা ঝুঁকির মুখে।
বিশ শতকে জ্বালানি নিরাপত্তার মূল প্রশ্ন ছিল—কোন দেশ কত সহজে তেল ও গ্যাস পাবে। কিন্তু একবিংশ শতকে সেই প্রশ্ন বদলে গেছে। এখন আসল শক্তি হলো কোন দেশ দ্রুত বিদ্যুতায়ন করতে পারবে, নিজের ভেতরে পরিচ্ছন্ন বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারবে এবং ভবিষ্যতের বিদ্যুৎব্যবস্থার জন্য দরকারি প্রযুক্তি ও সরবরাহশৃঙ্খল নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। এখানেই চীন ইউরোপের তুলনায় অনেক বেশি এগিয়ে।
চীনের মোট জ্বালানি ব্যবহারের প্রায় ৩০ শতাংশ এখন বিদ্যুৎনির্ভর। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে এই হার প্রায় ২০ শতাংশ। এই পার্থক্য শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি ভবিষ্যতের শিল্পশক্তির ইঙ্গিত। কারণ যেসব অর্থনীতি দ্রুত বিদ্যুৎনির্ভর উৎপাদনব্যবস্থা গড়তে পারবে, তারাই কম খরচে শিল্প চালাতে পারবে, বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকবে এবং জ্বালানি আমদানির ধাক্কা তুলনামূলকভাবে ভালোভাবে সামলাতে পারবে।
ইউরোপের ভেতরেও অবস্থার বড় পার্থক্য রয়েছে। স্পেন নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপর ভর করে জীবাশ্ম জ্বালানির অস্থিরতা থেকে কিছুটা সুরক্ষা তৈরি করতে পেরেছে। সেখানে পাইকারি বিদ্যুতের দাম প্রায় ৮০ শতাংশ সময় নবায়নযোগ্য জ্বালানি দ্বারা নির্ধারিত হয় এবং গড় দাম মেগাওয়াট-ঘণ্টাপ্রতি ৬০ ইউরোর কাছাকাছি। বিপরীতে ইতালি এখনো প্রাকৃতিক গ্যাসের বাজারের ওপর বেশি নির্ভরশীল। ফলে সেখানে বিদ্যুতের দাম মেগাওয়াট-ঘণ্টাপ্রতি প্রায় ১৩০ ইউরোর কাছাকাছি ঘোরাফেরা করছে।
এই তুলনা ইউরোপের নীতিনির্ধারকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়। শুধু জলবায়ু লক্ষ্য ঘোষণা করলেই হবে না; বিদ্যুৎব্যবস্থাকে সস্তা, স্থিতিশীল ও শিল্পবান্ধব করতে হবে। স্পেন দেখাচ্ছে, নবায়নযোগ্য জ্বালানি সঠিকভাবে ব্যবহার করলে বিদ্যুতের বাজারে একটি প্রতিরক্ষা বলয় তৈরি করা যায়। ইতালির অভিজ্ঞতা দেখাচ্ছে, গ্যাসনির্ভরতা বজায় থাকলে আন্তর্জাতিক বাজারের প্রতিটি ধাক্কা সরাসরি দেশের শিল্প ও ভোক্তার ওপর এসে পড়ে।
ইউরোপীয় কমিশনের অ্যাক্সেলারেটইইউ উদ্যোগ এই জরুরি বাস্তবতা থেকেই এসেছে। এর লক্ষ্য হলো বিদ্যুতচালিত যান, তাপপাম্প, নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ, শক্তিশালী বিদ্যুৎজাল এবং বিদ্যুৎ সংরক্ষণব্যবস্থা বাড়ানো। উদ্দেশ্য হলো জ্বালানি ব্যয় কমানো এবং আমদানি করা জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা হ্রাস করা। কিন্তু সমস্যা হলো, এই পরিকল্পনার লক্ষ্য বড় হলেও অর্থায়ন এখনো যথেষ্ট নয়। বিনিয়োগ ছাড়া এমন উদ্যোগ কাগজে উচ্চাকাঙ্ক্ষী মনে হতে পারে, কিন্তু বাস্তবে তা শক্তিশালী রূপ নেবে না।
চীন এখানে সম্পূর্ণ ভিন্ন পথে এগিয়েছে। দেশটি বহু বছর ধরে একটি সমন্বিত বিদ্যুতায়ন কৌশল গড়ে তুলেছে। তারা গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করেছে, পরিশোধন সক্ষমতা বাড়িয়েছে, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, ব্যাটারি, বিদ্যুতচালিত যান এবং শিল্প বিদ্যুতায়নে বিশাল বিনিয়োগ করেছে। এর ফলে পরিচ্ছন্ন জ্বালানির সরবরাহশৃঙ্খলের বহু গুরুত্বপূর্ণ অংশে চীনের প্রভাব তৈরি হয়েছে।
এখানে মূল বিষয় শুধু পরিবেশনীতি নয়, শিল্পনীতি। যে দেশ ব্যাটারি বানাবে, সৌর প্যানেল বানাবে, বিদ্যুতচালিত যান বানাবে, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ পরিশোধন করবে এবং সস্তা বিদ্যুৎ সরবরাহ করবে—সে দেশ ভবিষ্যতের শিল্প উৎপাদনে নেতৃত্ব দেবে। চীন এই বাস্তবতা আগেভাগে বুঝে জ্বালানি রূপান্তরকে অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত করেছে।
ইউরোপের জন্য উদ্বেগের আরেকটি বিষয় হলো শিল্প বিদ্যুতের দাম। বর্তমান জ্বালানি ধাক্কার আগেই ইউরোপে শিল্প বিদ্যুতের দাম চীনের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ ছিল। অর্থাৎ ইউরোপীয় শিল্প আগে থেকেই প্রতিযোগিতামূলক চাপে ছিল। এখন জীবাশ্ম জ্বালানির অস্থিরতা সেই চাপ আরও বাড়াচ্ছে। কম দামের বিদ্যুৎ এখন শুধু ভোক্তার স্বস্তির বিষয় নয়; এটি শিল্প উৎপাদন, কর্মসংস্থান, রপ্তানি এবং কৌশলগত স্বাধীনতার প্রশ্ন।
বিশ্ব হয়তো তেলনির্ভর শক্তির যুগ থেকে বিদ্যুৎনির্ভর শক্তির যুগে ঢুকছে। আগে তেলসমৃদ্ধ রাষ্ট্রগুলো বৈশ্বিক রাজনীতিতে বিশেষ প্রভাব রাখত। এখন ধীরে ধীরে এমন রাষ্ট্রগুলোর গুরুত্ব বাড়বে যারা সস্তা বিদ্যুৎ, পরিচ্ছন্ন প্রযুক্তি এবং বিদ্যুৎনির্ভর শিল্পব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। স্বল্প মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া জীবাশ্ম জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি থেকে লাভবান হতে পারে। কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে সুবিধা চলে যেতে পারে চীনের দিকে।
তবে ইউরোপের জন্য দরজা এখনো বন্ধ হয়নি। ইউরোপ চাইলে জ্বালানি রূপান্তর থেকে বড় সুবিধা নিতে পারে। কিন্তু তার জন্য শুধু নতুন লক্ষ্য, নতুন আইন বা নতুন ঘোষণায় কাজ হবে না। দরকার বড় বিনিয়োগ, স্থির নীতি এবং বাস্তবায়নক্ষম শিল্পকৌশল। না হলে ইউরোপ উপসাগরীয় তেল ও গ্যাসের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে শেষ পর্যন্ত চীনা পরিচ্ছন্ন প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়তে পারে।
ইউরোপ ইতিমধ্যে কিছু নীতিগত কাঠামো তৈরি করছে। নিট-শূন্য শিল্প আইন, গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল আইন, ইউরোপীয় চিপ আইন এবং শিল্প ত্বরান্বয়ন আইন—এসব উদ্যোগের লক্ষ্য হলো বিদ্যুতায়িত অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশে ইউরোপের নিয়ন্ত্রণ বাড়ানো। এগুলোর মাধ্যমে শিল্পভিত্তি শক্তিশালী করা, প্রয়োজনীয় কাঁচামালের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা চলছে।
এই নীতিগুলো আরও একটি বিষয় দেখায়—ইউরোপ ধীরে ধীরে বুঝতে পারছে যে বাজারকে একা ছেড়ে দিলে ভবিষ্যতের শিল্প প্রতিযোগিতায় জেতা যাবে না। সরকারি ক্রয়নীতি, রাষ্ট্রায়ত্ত সহায়তা এবং অন্যান্য নীতিগত হাতিয়ার এখন ইউরোপে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। লক্ষ্য হলো ইউরোপে তৈরি বা বিশ্বস্ত সরবরাহশৃঙ্খলভিত্তিক নিম্ন-কার্বন পণ্যকে এগিয়ে নেওয়া। অর্থাৎ ইউরোপও ধীরে ধীরে চীনের মতো কৌশলগত শিল্পনীতির পথে হাঁটতে শুরু করেছে।
কিন্তু সবচেয়ে বড় বাধা রয়ে গেছে অর্থায়ন। ২০২৪ সালের দ্রাঘি প্রতিবেদনে ইউরোপীয় প্রতিযোগিতা সক্ষমতা নিয়ে স্পষ্ট বলা হয়েছে, পরিচ্ছন্ন জ্বালানি রূপান্তরের জন্য যে বিনিয়োগ দরকার, তা বর্তমান সম্পদের তুলনায় অনেক বেশি। তাই সাধারণ অর্থায়ন ব্যবস্থা, এমনকি যৌথ ঋণপত্রের মতো উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে। ইউরোপ যদি সত্যিই বিদ্যুৎনির্ভর শিল্প ভবিষ্যৎ গড়তে চায়, তবে তাকে বড় আকারে এবং দীর্ঘ মেয়াদে বিনিয়োগ করতে হবে।
এখানেই ইউরোপের মূল দ্বিধা। নীতিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা আছে, কিন্তু বাস্তবায়নের শক্তি যথেষ্ট নয়। নিয়ম বানানোর ক্ষেত্রে ইউরোপ শক্তিশালী; কিন্তু উৎপাদন, প্রযুক্তি, সরবরাহশৃঙ্খল এবং বিনিয়োগে সেই শক্তিকে রূপ দিতে না পারলে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়বে। ভবিষ্যতের জ্বালানি নিরাপত্তা কেবল বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রশ্ন নয়; এটি শিল্প টিকে থাকার প্রশ্ন, প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন এবং ভূরাজনৈতিক প্রভাব ধরে রাখার প্রশ্ন।
চীনের সাফল্য এখানেই যে তারা জ্বালানি রূপান্তরকে শুধু জলবায়ু নীতি হিসেবে দেখেনি। তারা এটিকে শিল্পশক্তি, রপ্তানি সক্ষমতা, প্রযুক্তিগত নেতৃত্ব এবং আন্তর্জাতিক প্রভাব বাড়ানোর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। ইউরোপ যদি একই বাস্তবতা বুঝতে দেরি করে, তবে আগামী দিনের পরিচ্ছন্ন জ্বালানির বাজারেও সে আমদানিনির্ভর অবস্থায় আটকে যেতে পারে।
শেষ পর্যন্ত জ্বালানি নিরাপত্তার নতুন সংজ্ঞা খুব স্পষ্ট: যার হাতে সস্তা বিদ্যুৎ, উন্নত প্রযুক্তি এবং শক্তিশালী সরবরাহশৃঙ্খল থাকবে, তার হাতেই থাকবে ভবিষ্যতের শিল্পক্ষমতা। ইউরোপের সামনে এখন দুটি পথ। একদিকে রয়েছে নিয়ম, ঘোষণা ও সীমিত পদক্ষেপের ধীর পথ; অন্যদিকে রয়েছে বিনিয়োগ, শিল্পনীতি ও কৌশলগত সাহসের পথ। বিশ্ব যখন দ্রুত বিদ্যুৎনির্ভর অর্থনীতির দিকে এগোচ্ছে, তখন মাঝামাঝি অবস্থানে থাকার সুযোগ খুব কম।

