যুক্তরাষ্ট্রের ওপর দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা নির্ভরতা নিয়ে ইউরোপে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে। ইরান যুদ্ধ, ন্যাটোর ভেতরে টানাপোড়েন, জার্মানিতে মার্কিন সেনা কমানোর ইঙ্গিত এবং ট্রাম্প প্রশাসনের অস্থির কূটনৈতিক আচরণ—সব মিলিয়ে ইউরোপীয় নেতারা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি স্পষ্টভাবে বুঝতে পারছেন যে নিজেদের নিরাপত্তা নিজেদের হাতে নেওয়ার সময় এসেছে।
ইরান যুদ্ধ শুধু মধ্যপ্রাচ্যের সংকট নয়; এটি ইউরোপের নিরাপত্তা, অর্থনীতি এবং কূটনৈতিক ভবিষ্যতের ওপরও গভীর প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র যখন ইউরোপীয় মিত্রদের সঙ্গে আগাম আলোচনা ছাড়াই ইসরায়েলের সঙ্গে যৌথ সামরিক পদক্ষেপ নেয়, তখন ইউরোপীয় দেশগুলোর সামনে এক কঠিন বাস্তবতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে: ওয়াশিংটন সব সময় মিত্রদের পরামর্শ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেবে, এমন নিশ্চয়তা আর নেই।
প্রথম দিকে ট্রাম্প প্রশাসনের বার্তা ছিল আত্মবিশ্বাসী। তাদের অবস্থান ছিল, ইরান ও মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্র নিজেই সামলাতে পারবে। ইউরোপীয় মিত্রদের বলা হয়েছিল, তারা যেন ন্যাটোর পূর্ব সীমান্তে, বিশেষ করে রাশিয়ার কাছাকাছি অঞ্চলের নিরাপত্তায় মনোযোগ দেয়। কিন্তু যুদ্ধ দ্রুত শেষ হবে—এই আশা যখন ম্লান হতে থাকে, তখন সেই আত্মবিশ্বাসের জায়গায় আসে বিরক্তি, অভিযোগ এবং চাপের রাজনীতি।
ট্রাম্প পরে ন্যাটো মিত্রদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলেন যে তারা যুক্তরাষ্ট্রকে যথেষ্ট সহায়তা করছে না। তার দৃষ্টিতে, ইউরোপ যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে নিরাপত্তা সুবিধা নেয়, কিন্তু সংকটের সময়ে যথাযথভাবে পাশে দাঁড়ায় না। এই মনোভাব ন্যাটোর ভেতরে পুরোনো বিতর্ককে আবার সামনে আনে—ইউরোপ কি নিজের প্রতিরক্ষার জন্য যথেষ্ট ব্যয় করছে, নাকি এখনো অতিরিক্তভাবে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল?
ইরান যুদ্ধের প্রভাব শুধু সামরিক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। ইরান কার্যত হরমুজ প্রণালিতে চাপ সৃষ্টি করার পর জ্বালানির বাজারে অস্থিরতা দেখা দেয়। এই প্রণালি দিয়ে বৈশ্বিক তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ চলাচল করে। ফলে সেখানে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়া মানেই জ্বালানি দামে চাপ, সরবরাহ ব্যবস্থায় ঝুঁকি এবং ইউরোপীয় অর্থনীতিতে নতুন ধাক্কা।
ইউরোপ আগে থেকেই ইউক্রেন যুদ্ধের অভিঘাত সামলাচ্ছিল। তার ওপর ইরান যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র সরবরাহে বিলম্ব, জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি এবং শিল্পখাতে চাপ—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। প্লাস্টিক, বস্ত্র ও খেলনা শিল্পের মতো খাতেও এর প্রভাব পড়ার কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। মার্চের শেষ দিকে স্লোভেনিয়া প্রথম ইউরোপীয় দেশ হিসেবে জ্বালানি রেশনিং চালু করে, পরে আরও কিছু দেশ একই পথে হাঁটে।
এখানেই ইউরোপের সীমাবদ্ধতা সবচেয়ে স্পষ্ট। যুদ্ধের ক্ষতি ইউরোপ ভোগ করছে, কিন্তু যুদ্ধের গতিপথ নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা তার হাতে প্রায় নেই। হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচল নিশ্চিত করতে ইউরোপীয় নেতৃত্বে একটি জোট সম্ভাব্য পদক্ষেপ নিয়ে ভাবছে। কিন্তু তারা সামরিক সম্পদ মোতায়েনের আগে স্থায়ী যুদ্ধবিরতির অপেক্ষা করতে চায়। অর্থাৎ ইউরোপের অবস্থান এখনো প্রতিক্রিয়াশীল—নিজের কৌশলগত উদ্যোগের বদলে পরিস্থিতি তৈরি হলে তাতে সাড়া দেওয়া।
জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎসের মন্তব্য এই উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়ে দেয়। তিনি স্কুলশিক্ষার্থীদের সামনে বলেন, ইরানের নেতারা যুক্তরাষ্ট্রকে অপমানিত করেছে। ট্রাম্প এই মন্তব্যে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানান এবং বলেন, মের্ৎস বিষয়টি বুঝতে পারেননি। এরপর তিনি জার্মানিতে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি কমানোর কথা বিবেচনার ইঙ্গিত দেন।
পরবর্তী সময়ে পেন্টাগন জানায়, প্রায় ৪০,০০০ মার্কিন সেনার মধ্যে ৫,০০০ জনকে আগামী এক বছরের মধ্যে জার্মানি থেকে সরিয়ে নেওয়া হতে পারে। সংখ্যার দিক থেকে এটি বড় অংশ নয়, কিন্তু এর রাজনৈতিক ও প্রতীকী অর্থ বড়। কারণ জার্মানি ইউরোপে মার্কিন সামরিক উপস্থিতির কেন্দ্রীয় জায়গা। রামস্টাইন বিমানঘাঁটি, যুক্তরাষ্ট্রের ইউরোপীয় কমান্ড, আফ্রিকা কমান্ড এবং ল্যান্ডস্টুল আঞ্চলিক চিকিৎসাকেন্দ্র—সব মিলিয়ে জার্মানি যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক সামরিক কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।
এই সিদ্ধান্ত যদি পরিকল্পনাহীনভাবে বাস্তবায়িত হয়, তাহলে ন্যাটোর প্রশিক্ষণ, যৌথ মহড়া এবং প্রতিরোধ সক্ষমতার ওপর প্রভাব পড়তে পারে। ইউরোপের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো, যুক্তরাষ্ট্র যদি হঠাৎ সেনা কমায় আর ইউরোপ সেই ঘাটতি পূরণে প্রস্তুত না থাকে, তাহলে নিরাপত্তা কাঠামোয় শূন্যতা তৈরি হবে। এমন পরিস্থিতি রাশিয়ার জন্য কৌশলগত সুবিধা হয়ে উঠতে পারে।
তবে ইউরোপ পুরোপুরি অপ্রস্তুত নয়। বিশেষ করে জার্মানি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রতিরক্ষা নীতিতে বড় পরিবর্তন এনেছে। ১৯৪৯ সালে ন্যাটো প্রতিষ্ঠার পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপকে প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়াতে বলেছে। কিন্তু ২০২২ সালে রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণ এবং ২০২৪ সালে ট্রাম্পের পুনর্নির্বাচন ইউরোপীয় নেতাদের কাছে বার্তাটি আরও জরুরি করে তোলে।
জার্মানি ২০২৫ সালে প্রতিরক্ষায় ১১৪ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ২৪ শতাংশ বেশি। দেশটি গোলাবারুদের মজুত বাড়াচ্ছে, শত শত ট্যাংক এবং হাজার হাজার সশস্ত্র যান সংগ্রহ করছে, আকাশ প্রতিরক্ষা শক্তিশালী করছে, সাইবার ও উপগ্রহ নজরদারিতে বিনিয়োগ করছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক অস্ত্র বহনে সক্ষম যুদ্ধবিমান কিনছে। একসময় যে জার্মানিকে প্রতিরক্ষা ব্যয়ে পিছিয়ে থাকা দেশ হিসেবে দেখা হতো, সেই দেশ এখন ইউরোপের প্রধান প্রচলিত সামরিক শক্তি হওয়ার পথে এগোচ্ছে।
জার্মান প্রতিরক্ষামন্ত্রী বরিস পিস্টোরিয়াসের বক্তব্যও এই পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইউরোপে ভূমিকা কমায়, তাহলে ইউরোপ কীভাবে সেই ঘাটতি পূরণ করবে তার একটি পরিষ্কার রূপরেখা দরকার। তিনি চান, এই পরিবর্তন যেন ধাপে ধাপে হয়, যাতে মাঝপথে বিপজ্জনক সক্ষমতার ফাঁক তৈরি না হয়।
কিন্তু সমস্যা হলো, ট্রাম্প প্রশাসনের আচরণ অনেক সময় পরিকল্পনার চেয়ে ক্ষোভ, অভিযোগ ও তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার ওপর নির্ভরশীল মনে হয়। ফলে ইউরোপীয় নেতারা এখন শুধু সামরিক নয়, রাজনৈতিক ঝুঁকিও বিবেচনা করছেন। তাদের সামনে প্রশ্ন হলো, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেও কীভাবে এমন সক্ষমতা গড়ে তোলা যায়, যাতে ওয়াশিংটনের আকস্মিক সিদ্ধান্ত ইউরোপকে অরক্ষিত না করে।
জার্মান পার্লামেন্টের প্রতিরক্ষা কমিটির চেয়ারম্যান থমাস রেভেক্যাম্প বিষয়টি আরও সরাসরি বলেছেন। তার মতে, মার্কিন প্রেসিডেন্টের বারবার উসকানিমূলক আচরণ গ্রহণযোগ্য নয়। তবে এতে বিচলিত না হয়ে ইউরোপের উচিত নিজেদের সক্ষমতা দৃঢ়ভাবে বাড়ানো। তার বক্তব্যে একটি নতুন ইউরোপীয় মানসিকতার প্রতিফলন দেখা যায়—নিরাপত্তা নীতিতে ইউরোপকে নিজের পায়ে দাঁড়াতেই হবে।
এদিকে পেন্টাগনের ন্যাটো নীতি-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ পদে পরিবর্তনও প্রশ্ন তুলেছে। মার্ক জোন্স, যিনি দুই দশকের বেশি সময় ধরে ন্যাটো ও ইউরোপ নীতি নিয়ে কাজ করেছেন, তাকে মার্চে আকস্মিকভাবে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, তাকে প্রশাসনের ন্যাটো-সন্দেহী মনোভাবের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছিল। এমন একজন অভিজ্ঞ কর্মকর্তার অপসারণ ইউরোপীয় মিত্রদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সমন্বয়কে আরও দুর্বল করতে পারে।
এই ঘটনাটি শুধু একজন কর্মকর্তার বদলি নয়; এটি যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাটো দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনের ইঙ্গিতও হতে পারে। ওয়াশিংটন ন্যাটোর সবচেয়ে শক্তিশালী সদস্য। তাই সেখানে ন্যাটো নীতি পরিচালনার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি শুধু যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য নির্ধারণ করেন না, বরং মিত্রদের সঙ্গে সমন্বয়, বিরোধ মীমাংসা এবং কৌশলগত ঐক্য বজায় রাখতেও ভূমিকা রাখেন।
ট্রাম্প প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তা অবশ্য ইউরোপকে বেশি দায়িত্ব নিতে বললেও ন্যাটোকে পুরোপুরি দুর্বল করতে চান না। এলব্রিজ কলবি জার্মানির নতুন সামরিক কৌশলের প্রশংসা করেছিলেন, যেখানে ২০৩৯ সালের মধ্যে জার্মানিকে ইউরোপের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রচলিত সামরিক শক্তি হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা আছে। কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যেই ট্রাম্প ও মের্ৎসের টানাপোড়েন দেখিয়ে দেয়, বর্তমান যুক্তরাষ্ট্র-ইউরোপ সম্পর্ক কতটা অনিশ্চিত।
ঐতিহাসিকভাবে যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপে সেনা কমিয়েছে। স্নায়ুযুদ্ধের চূড়ান্ত সময়ে, ১৯৫০-এর দশকে, ইউরোপে প্রায় ৩৫০,০০০ মার্কিন সেনা ছিল, যাদের বেশিরভাগই পশ্চিম জার্মানিতে অবস্থান করত। ১৯৯০-এর দশকে লৌহ পর্দা পতনের পর এবং ২০০০-এর দশকে ইরাক ও আফগানিস্তান যুদ্ধের কারণে ইউরোপ থেকে অনেক সামরিক সম্পদ সরিয়ে নেওয়া হয়। ট্রাম্পের প্রথম প্রশাসনও জার্মানি থেকে প্রায় ১২,০০০ সেনা সরানোর পরিকল্পনা করেছিল। পরে বাইডেন প্রশাসন তা বাতিল করে এবং ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের পর ইউরোপে মার্কিন বাহিনী বাড়ায়।
বর্তমানে ইউরোপীয় অঞ্চলে প্রায় ৮০,০০০ মার্কিন সেনা রয়েছে, যার মধ্যে সবচেয়ে বেশি—৩৮,০০০—জার্মানিতে। তাই জার্মানিতে সেনা কমানোর সিদ্ধান্ত শুধু দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিষয় নয়; এটি পুরো ইউরোপীয় নিরাপত্তা স্থাপত্যের সঙ্গে জড়িত।
এখানে একটি বড় বিদ্রূপও রয়েছে। জার্মানি ইরান অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রকে রামস্টাইন ঘাঁটি ব্যবহার করতে দিয়েছে। অন্যদিকে স্পেন আকাশপথ বন্ধ করেছে, ইতালি সিসিলির একটি গুরুত্বপূর্ণ বিমানঘাঁটিতে মার্কিন বোমারু বিমান নামতে বাধা দিয়েছে। ব্রিটেন প্রথমে ঘাঁটি ব্যবহারের অনুরোধ নাকচ করলেও পরে সিদ্ধান্ত বদলায়। তবুও ট্রাম্পের ক্ষোভের বড় অংশ এসে পড়ে জার্মানির ওপর।
ইউরোপীয় দেশগুলোর বিভ্রান্তির আরেক কারণ হলো, যুক্তরাষ্ট্র আসলে কী চাইছে তা পরিষ্কার নয়। ঘাঁটি ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা বোঝা যায়। হরমুজ প্রণালিতে ইরানের পাতা মাইন সরাতে কী ধরনের সক্ষমতা দরকার, সে বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। কিন্তু বিস্তৃত সামরিক সহায়তার ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনের বার্তা অস্পষ্ট ছিল। অতীতে মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক অভিযানের সময় যুক্তরাষ্ট্র জোট গঠন করত, নির্দিষ্ট অনুরোধ জানাত এবং সমন্বিত পদক্ষেপ নিত। কিন্তু ইরান যুদ্ধের ক্ষেত্রে সেই কাঠামোগত প্রস্তুতি দেখা যায়নি।
প্রথমে বলা হলো, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল পরিস্থিতি সামলাতে পারবে। পরে ট্রাম্প সামাজিক মাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করে বললেন, মিত্রদের পাশে থাকা উচিত ছিল। কিন্তু ইউরোপীয় কর্মকর্তাদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসন প্রধান ইউরোপীয় অংশীদারদের স্পষ্টভাবে জানায়নি তারা ইরান যুদ্ধের জন্য কী ধরনের সহায়তা প্রত্যাশা করছে।
ন্যাটো মূলত প্রতিরক্ষামূলক জোট। যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি আক্রান্ত হয়নি। তাই ন্যাটো কাঠামোর অধীনে স্বয়ংক্রিয় সামরিক সহায়তার প্রশ্নও জটিল। তবে ইউরোপীয় কর্মকর্তাদের ধারণা, যুক্তরাষ্ট্র যদি নির্দিষ্ট সহায়তা চাইত, কিছু দেশ হয়তো তা বিবেচনা করত। কারণ ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক এখনো তাদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—বিশেষ করে যতদিন না তারা নিজেদের নিরাপত্তা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করার মতো সামরিক সক্ষমতা অর্জন করছে।
এই পুরো পরিস্থিতি ইউরোপের জন্য একটি সতর্কবার্তা। যুক্তরাষ্ট্র এখনো অপরিহার্য মিত্র, কিন্তু অন্ধ নির্ভরতার সময় শেষের পথে। ইউরোপ যদি নিজের নিরাপত্তা, অর্থনীতি এবং কূটনৈতিক স্বাধীনতা রক্ষা করতে চায়, তাহলে শুধু প্রতিরক্ষা বাজেট বাড়ালেই হবে না। প্রয়োজন সমন্বিত সামরিক পরিকল্পনা, যৌথ অস্ত্র উৎপাদন, আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা শিল্পের সম্প্রসারণ, দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার রাজনৈতিক কাঠামো এবং ন্যাটোর ভেতরে ইউরোপীয় স্তম্ভকে শক্তিশালী করা।
ইরান যুদ্ধ তাই ইউরোপের জন্য একটি দূরের যুদ্ধ নয়। এটি দেখিয়ে দিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংকট ইউরোপের জ্বালানি বাজারে আঘাত করতে পারে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অগ্রাধিকার ইউরোপে অস্ত্র সরবরাহ বিলম্বিত করতে পারে, আর ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক অস্থিরতা ন্যাটোর ভেতরে আস্থার সংকট তৈরি করতে পারে।
সবচেয়ে বড় কথা, ইউরোপ এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে তাকে দুই বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য রাখতে হবে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রকে পুরোপুরি হারানো যাবে না, কারণ মার্কিন পারমাণবিক ছাতা ও সামরিক অবকাঠামো এখনো ইউরোপীয় নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিটি সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করাও আর নিরাপদ নয়।
তাই ইউরোপের সামনে এখন মূল প্রশ্ন একটাই: তারা কি ধীরে ধীরে নিজেদের নিরাপত্তার দায়িত্ব নেওয়ার মতো বাস্তব সক্ষমতা গড়ে তুলতে পারবে, নাকি রাজনৈতিক ঘোষণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে? ইরান যুদ্ধ, ট্রাম্পের চাপ এবং ন্যাটোর অভ্যন্তরীণ অস্বস্তি—সব মিলিয়ে উত্তর দেওয়ার সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে।

