মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতকে দীর্ঘদিন একই শিবিরের দুই ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে দেখা হয়েছে। ইয়েমেন যুদ্ধ, কাতার অবরোধ, রাজনৈতিক ইসলামবিরোধী অবস্থান কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নিরাপত্তা সম্পর্ক—অনেক ক্ষেত্রেই দুই দেশকে একসঙ্গে চলতে দেখা গেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো দেখাচ্ছে, এই সম্পর্কের ভেতরে জমে থাকা প্রতিযোগিতা এখন আর আড়ালে নেই। বরং তেলবাজার, ইয়েমেন, সুদান, লিবিয়া, ইরান, ইসরায়েল এবং আঞ্চলিক নেতৃত্বের প্রশ্নে রিয়াদ ও আবুধাবির অবস্থান ক্রমেই আলাদা হয়ে যাচ্ছে।
এই দ্বন্দ্ব হঠাৎ তৈরি হয়নি। এর শিকড় ইতিহাস, পরিবার, আদর্শ এবং ক্ষমতার হিসাবের গভীরে। সৌদি আরব নিজেকে আরব ও মুসলিম বিশ্বের স্বাভাবিক নেতৃত্বের দাবিদার মনে করে। অন্যদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাত, আয়তন ও জনসংখ্যায় ছোট হলেও, নিজেকে বৈশ্বিক পর্যায়ের প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়। এই দুই দৃষ্টিভঙ্গির সংঘর্ষই আজ উপসাগরীয় রাজনীতির অন্যতম বড় বাস্তবতা হয়ে উঠেছে।
সৌদি–আমিরাত সম্পর্কের টানাপোড়েন বোঝার জন্য পঞ্চাশের দশকের বুরাইমি বিরোধ গুরুত্বপূর্ণ। ওই সময় সৌদি রাজপরিবার, ওমান এবং তখনকার ট্রুসিয়াল স্টেটসের মধ্যে মরুভূমির একটি কৌশলগত অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধ তৈরি হয়। অঞ্চলটি তেলসম্ভাবনার কারণে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। পরে এই ট্রুসিয়াল স্টেটসই সংযুক্ত আরব আমিরাতে রূপ নেয়। এই ইতিহাস আমিরাতের রাজনৈতিক স্মৃতিতে সৌদি প্রভাবের প্রশ্নটিকে অত্যন্ত সংবেদনশীল করে রেখেছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিষ্ঠাতা শেখ জায়েদ বিন সুলতান আল নাহিয়ান সেই বিরোধের সঙ্গে ঐতিহাসিকভাবে যুক্ত ছিলেন। আজ তাঁর ছেলে শেখ মুহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান আমিরাতের প্রেসিডেন্ট। অপরদিকে সৌদি আরবের কার্যত ক্ষমতাকেন্দ্রে আছেন যুবরাজ মুহাম্মদ বিন সালমান। দুই নেতার সম্পর্ক একসময় ঘনিষ্ঠ ছিল। অনেকে মনে করেন, মুহাম্মদ বিন সালমানের ক্ষমতায় উত্থানের শুরুতে মুহাম্মদ বিন জায়েদ তাঁর গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শদাতা ছিলেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই সহযোগিতা প্রতিযোগিতায় রূপ নিয়েছে।
সবচেয়ে বড় প্রতীকী পরিবর্তন এসেছে তেলের রাজনীতিতে। সংযুক্ত আরব আমিরাত দীর্ঘ ছয় দশক পর সৌদি নেতৃত্বাধীন ওপেক থেকে বেরিয়ে গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। আবুধাবি বেশি পরিমাণে তেল উত্তোলন করে দ্রুত মুনাফা নিতে চায়। অন্যদিকে সৌদি আরব দীর্ঘমেয়াদে বাজার নিয়ন্ত্রণ করে তেলের দাম স্থিতিশীল ও তুলনামূলক উঁচু রাখতে আগ্রহী। এই পার্থক্য শুধু অর্থনৈতিক নয়; এটি নেতৃত্বের প্রশ্নও। সৌদি আরব ওপেককে নিজের প্রভাব বিস্তারের একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হিসেবে দেখে। আর আমিরাত মনে করে, সৌদি নেতৃত্বের অধীনে থাকলে তার বৈশ্বিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা সীমিত হয়ে যায়।
জনসংখ্যা ও সম্পদের দিক থেকে সৌদি আরব অনেক বড়। দেশটির জনসংখ্যা প্রায় তিন কোটি পঞ্চাশ লাখ। অন্যদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের জনসংখ্যা প্রায় এক কোটি, যার মধ্যে মাত্র প্রায় দশ লাখ আমিরাতি নাগরিক। সৌদি আরবের কাছে মক্কা ও মদিনার মতো ইসলামের দুই পবিত্রতম নগরী রয়েছে। এই ধর্মীয়, ভৌগোলিক ও জনসংখ্যাগত বাস্তবতা সৌদি নেতৃত্বের দাবিকে শক্তিশালী করে। কিন্তু আমিরাত গত কয়েক দশকে বাণিজ্য, প্রযুক্তি, বন্দর, বিনিয়োগ, কূটনীতি ও সামরিক প্রভাবের মাধ্যমে নিজেকে আকারের চেয়ে অনেক বড় শক্তি হিসেবে তুলে ধরেছে।
এই দ্বন্দ্ব শুধু তেলবাজারে সীমাবদ্ধ নয়। সুদান, ইয়েমেন ও লিবিয়ায় দুই দেশ ভিন্ন ভিন্ন পক্ষকে সমর্থন করছে। সুদানের গৃহযুদ্ধে আমিরাত র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেসের প্রতি সমর্থনের অভিযোগে আলোচনায় এসেছে, আর সৌদি আরব রাষ্ট্রীয় কাঠামো ও জাতীয় ঐক্য রক্ষার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। ইয়েমেনে আমিরাত দক্ষিণাঞ্চলীয় বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ, जबकि সৌদি আরব ইয়েমেনের কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রব্যবস্থাকে ভেঙে পড়া থেকে রক্ষা করতে চায়। এই পার্থক্য দুই দেশের আঞ্চলিক কৌশলের মৌলিক ব্যবধান দেখায়।
আমিরাতের দৃষ্টিতে ছোট রাষ্ট্র হিসেবে টিকে থাকতে হলে কৌশলগত গভীরতা তৈরি করা জরুরি। তাই সে লোহিত সাগর, বাব আল মান্দেব, হর্ন অব আফ্রিকা ও ইয়েমেনের উপকূলীয় অঞ্চলে প্রভাব বাড়াতে আগ্রহী। সুদানে যদি আমিরাতপন্থী শক্তি শক্তিশালী হয়, তাহলে লোহিত সাগরের অপর পারে তার প্রভাব বাড়বে। ইয়েমেনের দক্ষিণে স্বাধীনতাকামী শক্তি সফল হলে বাব আল মান্দেব প্রণালীর কাছাকাছি আমিরাতের কৌশলগত সুবিধা তৈরি হতে পারে। কিন্তু সৌদি আরব এসব পদক্ষেপকে নিজের নিরাপত্তা বলয়ের জন্য ঝুঁকি হিসেবে দেখে।
ইরান প্রশ্নেও দুই দেশের হিসাব আলাদা হলেও প্রতিযোগিতার রেখা স্পষ্ট। আমিরাত দীর্ঘদিন ধরে পারস্য উপসাগরে ইরানের প্রভাব নিয়ে সতর্ক। একইসঙ্গে সৌদি আরবও ইরানকে আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখে। তবে সাম্প্রতিক যুদ্ধপরিস্থিতি, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার আশঙ্কা, এবং হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা—এসব বিষয় দুই দেশের কৌশলকে আরও তীক্ষ্ণ করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান সংকট লোহিত সাগর ও বিকল্প জ্বালানি রপ্তানি পথের গুরুত্ব বাড়িয়ে দিয়েছে। এতে সৌদি আরবের পূর্ব–পশ্চিম পাইপলাইনের গুরুত্ব যেমন বেড়েছে, তেমনি আমিরাতও নিজের সামুদ্রিক প্রভাব বাড়ানোর যুক্তি খুঁজে পেয়েছে।
আরেকটি বড় পার্থক্য ইসরায়েলকে কেন্দ্র করে। সংযুক্ত আরব আমিরাত দুই হাজার বিশ সালে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করে। এতে আরব লীগের দীর্ঘদিনের অবস্থান থেকে আমিরাত কার্যত আলাদা পথে যায়। সৌদি আরবের তৈরি দুই হাজার দুই সালের শান্তি প্রস্তাবে বলা হয়েছিল, উনিশ শত সাতষট্টির আগের সীমারেখা অনুযায়ী স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আগে আরব দেশগুলোর ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা উচিত নয়। গাজা যুদ্ধের পর সৌদি সমাজে ইসরায়েলবিরোধী মনোভাব আরও জোরদার হয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, দুই হাজার তেইশ সালের শেষ দিকে এক জরিপে ছিয়ানব্বই শতাংশ সৌদি নাগরিক ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার পক্ষে মত দেন।
এই জায়গায় সৌদি নেতৃত্বের জন্য জনমত গুরুত্বপূর্ণ। মুহাম্মদ বিন সালমান একদিকে আধুনিকীকরণ ও অর্থনৈতিক রূপান্তরের প্রকল্প এগিয়ে নিচ্ছেন, অন্যদিকে আরব ও মুসলিম বিশ্বের জনমতকেও পুরোপুরি উপেক্ষা করতে পারছেন না। বিপরীতে আমিরাতের শাসনব্যবস্থা তুলনামূলকভাবে বেশি কেন্দ্রীয়কৃত, এবং আবুধাবি অনেক ক্ষেত্রে জনমতের চাপ ছাড়াই দ্রুত কৌশলগত সিদ্ধান্ত নিতে পারে। ফলে ইসরায়েল প্রশ্নে দুই দেশের অবস্থানের দূরত্ব আরও দৃশ্যমান হয়েছে।
তবে এই দ্বন্দ্বকে সরল শত্রুতা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। সৌদি আরব ও আমিরাত এখনো নিরাপত্তা, বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে পরস্পরের বাস্তবতা বোঝে। দুই দেশই যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ছাতার গুরুত্ব অস্বীকার করতে পারে না। কিন্তু একই সঙ্গে তারা আলাদা জোটও গড়ছে। আমিরাত ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করছে। সৌদি আরব তুরস্ক, মিসর ও পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ককে নতুনভাবে সাজাচ্ছে। অর্থাৎ উভয় দেশই যুক্তরাষ্ট্রকে ধরে রেখে নিজেদের আঞ্চলিক বলয় তৈরি করতে চাইছে।
এই প্রতিযোগিতার অর্থনৈতিক প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও পড়তে পারে। তেল উৎপাদন নিয়ে সৌদি আরব ও আমিরাতের বিরোধ যদি মূল্যযুদ্ধে রূপ নেয়, তাহলে এশিয়া, ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তারা সরাসরি প্রভাব অনুভব করবে। তেলের দাম কমলে আমদানিকারক দেশগুলো সাময়িক সুবিধা পেতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে বাজার অস্থির হলে জ্বালানি পরিকল্পনা, মুদ্রাস্ফীতি ও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে চাপ তৈরি হতে পারে।
সব মিলিয়ে সৌদি–আমিরাত দ্বন্দ্ব হলো নেতৃত্বের লড়াই, নিরাপত্তার লড়াই এবং ভবিষ্যৎ মধ্যপ্রাচ্যকে কে কীভাবে গড়বে—তার লড়াই। সৌদি আরব পুরনো মর্যাদা, ধর্মীয় গুরুত্ব, জনসংখ্যা ও জ্বালানি শক্তির ভিত্তিতে নেতৃত্ব ধরে রাখতে চায়। আমিরাত ছোট রাষ্ট্র হয়েও বন্দর, অর্থনীতি, প্রযুক্তি, সামরিক অংশীদারিত্ব ও কূটনৈতিক সাহসের মাধ্যমে বড় শক্তির মতো আচরণ করতে চায়।
এই দ্বন্দ্ব আগামী দিনে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। কারণ মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন বাড়ছে, ইরান–ইসরায়েল উত্তেজনা নতুন মাত্রা পেয়েছে, গাজা যুদ্ধ আরব জনমতকে বদলে দিয়েছে, এবং জ্বালানি বাজারে পুরনো নিয়ম ভাঙছে। ফলে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সম্পর্ক শুধু দুই প্রতিবেশীর দ্বন্দ্ব নয়; এটি পুরো মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার মানচিত্র বদলে দেওয়ার মতো একটি প্রক্রিয়া।

